একসময় ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন বৃষ্টি বিশ্বাস (৩২)। সেই স্বপ্নের টানে ভেঙেছিলেন আগের সংসার, ছেড়েছিলেন ধর্মীয় পরিচয়, পিতৃপরিবার ও পরিচিত সামাজিক পরিমণ্ডল। প্রতিবেশী ইব্রাহিম মোল্যার প্রেমের প্রস্তাব ও নানা প্রলোভনে সাড়া দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী বৃষ্টি ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হন। এরপর ইব্রাহিম মিয়াকে বিয়ে করে শুরু করেন নতুন জীবন।
কেটে গেছে ১৪ বছর। তাদের সংসারে জন্ম নিয়েছে দুই সন্তান। কিন্তু যে মানুষের জন্য একদিন সবকিছু ছেড়েছিলেন, আজ সেই স্বামীর বিরুদ্ধেই নির্যাতন, পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং বাড়ি থেকে বিতাড়নের চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন বৃষ্টি।
ইব্রাহিম মোল্যা ময়না ইউনিয়ন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
বৃষ্টির অভিযোগ, সম্প্রতি ইব্রাহিম সালথা উপজেলার বাহিরদিয়া এলাকায় আরেকটি বিয়ে করেছেন। নতুন স্ত্রীকে নিয়ে বর্তমান বাড়িতে সংসার করতে তাকে, তার বৃদ্ধ শাশুড়ি ও দুই সন্তানকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তিনি জানান, শুনেছেন ইব্রাহিম তাকে তালাক দিয়েছেন। তবে এখনো আদালতের কোনো কাগজপত্র হাতে পাননি।
বৃষ্টির আক্ষেপ, যে সংসারের জন্য নিজের জন্মপরিবার, ধর্মীয় পরিচয় ও আগের জীবনের সব বন্ধন ছেড়েছিলেন, আজ সেই সংসারেই তার জায়গা নেই। শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর উপার্জনের অর্থে কষ্ট করে তৈরি করা বাড়িতে দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতে চান তিনি। সন্তানদের নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো আশ্রয় নেই তার। প্রয়োজনে জীবন দেবেন, তবু বসতবাড়ি ছেড়ে যাবেন না বলে জানান বৃষ্টি।
বৃষ্টির অভিযোগ, বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই স্বামীর আচরণ বদলাতে শুরু করে। ছেলে জন্মের পর দ্বিতীয় সন্তান সুপ্তি তার গর্ভে থাকতেই ভাগ্য বদলাতে সৌদি আরব পাড়ি জমান ইব্রাহিম। আট বছর প্রবাসজীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর তার আচরণ আরও বদলে যায়। মাদকাসক্ত হয়ে কাজকর্ম ছেড়ে ঘরে বসে থাকতেন তিনি।
গত তিন-চার বছর ধরে সন্দেহের বশে বৃষ্টিকে অযথা দোষারোপ করতেন ইব্রাহিম। পরকীয়ার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে তাকে সন্দেহ করতেন। এ নিয়ে শারীরিক নির্যাতন, গালিগালাজসহ নানা ধরনের নিগ্রহের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন বৃষ্টি।
তার অভিযোগ, দুই বছর আগে তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে হাত, বুকসহ শরীরের প্রায় ২৫ শতাংশ পুড়ে যায়। দুই হাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখনো স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেন না তিনি। সে সময় মামলা করতে চাইলে ইব্রাহিম তাকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার আশ্বাস দেন। প্রয়োজনে দেশের বাইরে নিয়ে অস্ত্রোপচার করানোর কথাও বলেন। কিন্তু তার সেই আশ্বাস ছিল মিথ্যা। এভাবে আবারও প্রতারিত হয়েছেন বলে অভিযোগ বৃষ্টির।
বৃষ্টির পাশে দাঁড়িয়েছেন তার শাশুড়ি জুলেখা বেগম (৬০)। ছেলের বিরুদ্ধে পুত্রবধূর অভিযোগের সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি জানান, ছেলের অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাকেও মারধর ও অপমানের শিকার হতে হয়। নিজের গর্ভে ধারণ করা ছেলে যা বলে, তা মুখে উচ্চারণ করা যায় না।
জুলেখা বেগম জানান, তার ছেলে অভিযোগ করে, তিনি নাকি বাইরের লোক এনে পুত্রবধূর সঙ্গে দেহ ব্যবসা করেন। স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটা থেকে তাকেও বের করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে তিনি ওই বাড়িতেই থাকতে চান। ছেলে চাইলে অন্য জমিতে ঘর করে থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইব্রাহিমের বোন শেফালী পারভীন জানান, তার ভাই মাদকাসক্ত ও নির্যাতনকারী। স্ত্রী-সন্তান এমনকি নিজের মাকেও মারধর করেন। তিনি চান, তার মা, ভাতিজা-ভাতিজি ও বৃষ্টি যেন বাবার পৈতৃক ভিটায় থাকতে পারেন। ভাই নতুন বিয়ে করেছেন, তিনি যেখানে খুশি সেখানে থাকুন।
ইব্রাহিমের ১১ বছর বয়সি ছেলে আউস বলে, তার বাবা বাড়িতে এসে তার গলায় ছুরি ধরে জানতে চান, বাড়িতে কে এসেছিল। মিথ্যা বললে জবাই করে ফেলার হুমকি দেন। কেউ আসেনি বললে পরিবারের সবাইকে মারধর করেন বলেও অভিযোগ শিশুটির।
অভিযোগের বিষয়ে থানায় এক সালিশ বৈঠকে ইব্রাহিম মোল্যা বলেন, বৃষ্টির চরিত্র ভালো নয়। তাকে তালাক দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টি কোথায় যাবেন, তা তিনি জানেন না। তার মা ও সন্তানরা তার সঙ্গেই থাকবেন। বৃষ্টি নিজেই নিজের শরীরে আগুন লাগিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ময়না ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হক মৃধা জানান, বিষয়টির একটি মানবিক সমাধান হওয়া উচিত। মেয়েটি কোথায় যাবেন, সব দিক বিবেচনা করে একটি সুষ্ঠু সমাধানের চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান জানান, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
বৃষ্টি তার ওপর নির্যাতনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিরাপত্তা এবং দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে বসতবাড়িতে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন।
Tareq Jamil 





















