ঢাকা ০৩:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ সাময়িক বরখাস্ত ‘তোমরা মারো না কেন, মারো’, সাদ্দামকে বলেছিলেন কাদের দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ নারী সাহাবি ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন: ফরম নিলেন রাষ্ট্রপতির ভাই সুশাসন ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার বিএনপি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে: এটিএম আজহার ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ বিদ্যুৎ বিলের টাকা লুটপাট করছেন কুরুম, শেল্টার দিচ্ছে কারা? ফ্যাসিস্ট আ.লীগের নেতাকর্মীদের বিচারে ব্যর্থ হলে ভীরুতার পরিচয় দেব আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তেই বিশ্বকাপে যায়নি বাংলাদেশ

কিস্তির মূল্য আগাম পরিশোধে অবশিষ্ট লাভ মওকুফের বিধান কী?

  • Tareq Jamil
  • আপডেট সময় : ১১:২৬:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২২৮ বার পড়া হয়েছে

ছবি: সংগৃহীত

কিস্তিতে কেনাকাটার প্রচলন আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। তবে কিস্তির মেয়াদ, মোট মূল্য এবং এর আনুষঙ্গিক শর্তগুলোর ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তের সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা রয়েছে। কিস্তির চুক্তির পর নির্দিষ্ট মেয়াদের আগেই যদি ক্রেতা পুরো অর্থ পরিশোধ করতে চান এবং বিক্রেতা তার লাভ বা পাওনা থেকে কিছু অংশ ছেড়ে দিতে চান, তবে তার সুনির্দিষ্ট কিছু বিধান রয়েছে। ইসলামি বাণিজ্যিক নীতিমালায় স্বচ্ছতা ও সুনির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণকে অপরিহার্য করা হয়েছে।

কিস্তির লেনদেন ও আগাম পরিশোধের শরিয়তি বিধানসমূহ

চুক্তির সময় মূল্য ও মেয়াদ নির্দিষ্ট থাকা

কিস্তিতে যেকোনো পণ্য, যেমন গাড়ি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে চুক্তির শুরুতে গাড়িটির মোট বিক্রয়মূল্য এবং কিস্তির সুনির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারিত থাকা একান্ত জরুরি। মেয়াদ বা মূল্য কোনোটিই অস্পষ্ট বা ঝুলন্ত রাখার কোনো সুযোগ নেই। পবিত্র কুরআনে লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى فَاكْتُبُوهُ

‘হে ইমানদারগণ! যখন তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ঋণের লেনদেন কর, তখন তা লিখে রাখ।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২৮২)

চুক্তির সময় একক মূল্য চূড়ান্ত করা

চুক্তি করার সময় ১২ মাস ও ২৪ মাসের জন্য পৃথক দুটি মূল্য ঝুলিয়ে রেখে কোনো একটি মূল্য চূড়ান্ত না করে লেনদেন শেষ করা জায়েজ নয়। কেননা, এতে বিক্রয়মূল্য অনির্দিষ্ট থেকে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন অনিশ্চিত ও প্রতারণামূলক বাণিজ্যে নিষেধ করেছেন—

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ بَيْعِ الْحَصَاةِ وَعَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কঙ্কর নিক্ষেপের মাধ্যমে বিক্রয় এবং প্রতারণামূলক বা অনিশ্চিত (ঘরর) বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন।’ (মুসলিম ১৫১৩)

 

সুতরাং, বিক্রয়মূল্য অস্পষ্ট বা অনির্দিষ্ট থাকলে সেই ক্রয়-বিক্রয় শরিয়তের দৃষ্টিতে সহিহ হয় না। তাই ২৪ মাসের জন্য একটি নির্দিষ্ট মোট মূল্য চূড়ান্ত করেই চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে।

স্বেচ্ছায় লাভ মওকুফের এখতিয়ার

২৪ মাসের নির্দিষ্ট চুক্তির পর ক্রেতা যদি নির্ধারিত মেয়াদের আগেই অর্থাৎ ১২ মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে দেন এবং বিক্রেতা সন্তুষ্ট হয়ে অবশিষ্ট কিস্তির টাকা বা লাভের অংশ বিনা শর্তে স্বেচ্ছায় মওকুফ করেন, তবে তা সম্পূর্ণ জায়েজ। এটি বিক্রেতার নিজস্ব উদারতা ও পাওনা থেকে কিছু অংশ ছেড়ে দেওয়ার নামান্তর, যা পারস্পরিক সদ্ভাব বৃদ্ধি করে। হাদিসে পাকে এসেছে—

رَحِمَ اللَّهُ رَجُلًا سَمْحًا إِذَا بَاعَ، وَإِذَا اشْتَرَى، وَإِذَا اقْتَضَى

‘আল্লাহ সেই ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যে বিক্রয়কালে, ক্রয়কালে এবং পাওনা আদায়ের সময় সহজ ও উদার নীতি অবলম্বন করে।’ (বুখারি ২০৭৬)

পূর্বশর্ত আরোপ নিষিদ্ধ

চুক্তির প্রারম্ভে বা মূল চুক্তির সময় এমন কোনো শর্ত জুড়ে দেওয়া জায়েজ নয় যে, ‘ক্রেতা ১২ মাসের মধ্যে মূল্য পরিশোধ করলে অবশ্যই অবশিষ্ট লাভ মওকুফ করা হবে।’ যদি এমন পূর্বশর্ত বা চুক্তি থাকে, তবে তা শরিয়তসম্মত হবে না। বরং বিষয়টি সম্পূর্ণ বিক্রেতার নিজস্ব ইখতিয়ারাধীন বা ইচ্ছাধীন থাকতে হবে; তিনি চাইলে মওকুফ করতে পারেন, আবার নাও করতে পারেন।

পরিশেষে, কিস্তির লেনদেন সর্বদা স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট শর্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। আগাম পরিশোধের ক্ষেত্রে বিক্রেতার স্বতঃস্ফূর্ত উদারতা বা ছাড় জায়েজ হলেও তা কোনো পূর্বনির্ধারিত চুক্তির শর্ত হিসেবে সাব্যস্ত করা যাবে না। পারস্পরিক সততা, স্বচ্ছতা ও উদার মানসিকতাই ইসলামি ব্যবসার মূল সৌন্দর্য, যা ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই বরকতের ছায়ায় আবদ্ধ করে।

কিস্তি   ইসলাম   কুরআন   হাদিস   আমল   ইবাদত

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ সাময়িক বরখাস্ত

কিস্তির মূল্য আগাম পরিশোধে অবশিষ্ট লাভ মওকুফের বিধান কী?

আপডেট সময় : ১১:২৬:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কিস্তিতে কেনাকাটার প্রচলন আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। তবে কিস্তির মেয়াদ, মোট মূল্য এবং এর আনুষঙ্গিক শর্তগুলোর ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তের সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা রয়েছে। কিস্তির চুক্তির পর নির্দিষ্ট মেয়াদের আগেই যদি ক্রেতা পুরো অর্থ পরিশোধ করতে চান এবং বিক্রেতা তার লাভ বা পাওনা থেকে কিছু অংশ ছেড়ে দিতে চান, তবে তার সুনির্দিষ্ট কিছু বিধান রয়েছে। ইসলামি বাণিজ্যিক নীতিমালায় স্বচ্ছতা ও সুনির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণকে অপরিহার্য করা হয়েছে।

কিস্তির লেনদেন ও আগাম পরিশোধের শরিয়তি বিধানসমূহ

চুক্তির সময় মূল্য ও মেয়াদ নির্দিষ্ট থাকা

কিস্তিতে যেকোনো পণ্য, যেমন গাড়ি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে চুক্তির শুরুতে গাড়িটির মোট বিক্রয়মূল্য এবং কিস্তির সুনির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারিত থাকা একান্ত জরুরি। মেয়াদ বা মূল্য কোনোটিই অস্পষ্ট বা ঝুলন্ত রাখার কোনো সুযোগ নেই। পবিত্র কুরআনে লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى فَاكْتُبُوهُ

‘হে ইমানদারগণ! যখন তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ঋণের লেনদেন কর, তখন তা লিখে রাখ।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২৮২)

চুক্তির সময় একক মূল্য চূড়ান্ত করা

চুক্তি করার সময় ১২ মাস ও ২৪ মাসের জন্য পৃথক দুটি মূল্য ঝুলিয়ে রেখে কোনো একটি মূল্য চূড়ান্ত না করে লেনদেন শেষ করা জায়েজ নয়। কেননা, এতে বিক্রয়মূল্য অনির্দিষ্ট থেকে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন অনিশ্চিত ও প্রতারণামূলক বাণিজ্যে নিষেধ করেছেন—

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ بَيْعِ الْحَصَاةِ وَعَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কঙ্কর নিক্ষেপের মাধ্যমে বিক্রয় এবং প্রতারণামূলক বা অনিশ্চিত (ঘরর) বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন।’ (মুসলিম ১৫১৩)

 

সুতরাং, বিক্রয়মূল্য অস্পষ্ট বা অনির্দিষ্ট থাকলে সেই ক্রয়-বিক্রয় শরিয়তের দৃষ্টিতে সহিহ হয় না। তাই ২৪ মাসের জন্য একটি নির্দিষ্ট মোট মূল্য চূড়ান্ত করেই চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে।

স্বেচ্ছায় লাভ মওকুফের এখতিয়ার

২৪ মাসের নির্দিষ্ট চুক্তির পর ক্রেতা যদি নির্ধারিত মেয়াদের আগেই অর্থাৎ ১২ মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে দেন এবং বিক্রেতা সন্তুষ্ট হয়ে অবশিষ্ট কিস্তির টাকা বা লাভের অংশ বিনা শর্তে স্বেচ্ছায় মওকুফ করেন, তবে তা সম্পূর্ণ জায়েজ। এটি বিক্রেতার নিজস্ব উদারতা ও পাওনা থেকে কিছু অংশ ছেড়ে দেওয়ার নামান্তর, যা পারস্পরিক সদ্ভাব বৃদ্ধি করে। হাদিসে পাকে এসেছে—

رَحِمَ اللَّهُ رَجُلًا سَمْحًا إِذَا بَاعَ، وَإِذَا اشْتَرَى، وَإِذَا اقْتَضَى

‘আল্লাহ সেই ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যে বিক্রয়কালে, ক্রয়কালে এবং পাওনা আদায়ের সময় সহজ ও উদার নীতি অবলম্বন করে।’ (বুখারি ২০৭৬)

পূর্বশর্ত আরোপ নিষিদ্ধ

চুক্তির প্রারম্ভে বা মূল চুক্তির সময় এমন কোনো শর্ত জুড়ে দেওয়া জায়েজ নয় যে, ‘ক্রেতা ১২ মাসের মধ্যে মূল্য পরিশোধ করলে অবশ্যই অবশিষ্ট লাভ মওকুফ করা হবে।’ যদি এমন পূর্বশর্ত বা চুক্তি থাকে, তবে তা শরিয়তসম্মত হবে না। বরং বিষয়টি সম্পূর্ণ বিক্রেতার নিজস্ব ইখতিয়ারাধীন বা ইচ্ছাধীন থাকতে হবে; তিনি চাইলে মওকুফ করতে পারেন, আবার নাও করতে পারেন।

পরিশেষে, কিস্তির লেনদেন সর্বদা স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট শর্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। আগাম পরিশোধের ক্ষেত্রে বিক্রেতার স্বতঃস্ফূর্ত উদারতা বা ছাড় জায়েজ হলেও তা কোনো পূর্বনির্ধারিত চুক্তির শর্ত হিসেবে সাব্যস্ত করা যাবে না। পারস্পরিক সততা, স্বচ্ছতা ও উদার মানসিকতাই ইসলামি ব্যবসার মূল সৌন্দর্য, যা ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই বরকতের ছায়ায় আবদ্ধ করে।

কিস্তি   ইসলাম   কুরআন   হাদিস   আমল   ইবাদত