সন্তান আল্লাহ তাআলার এক মহামূল্যবান নিয়ামত। নবজাতকের আগমনে একটি পরিবার যেমন আনন্দে ভরে ওঠে, তেমনি ইসলামও এই আনন্দকে কৃতজ্ঞতা ও ইবাদতের মাধ্যমে প্রকাশ করার শিক্ষা দিয়েছে। সেই সুন্নতগুলোর অন্যতম হলো আকিকা। তবে নানা কারণে অনেক পরিবার সন্তানের জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করতে পারেন না। তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে কি আকিকা করার সুযোগ আর থাকে না? শরিয়তের আলোকে আলেমদের বক্তব্য হলো, সপ্তম দিন সর্বোত্তম হলেও নির্ধারিত সময় অতিক্রম হয়ে গেলে সামর্থ্য অনুযায়ী পরবর্তী সময়েও আকিকা করা বৈধ এবং এর মাধ্যমে সুন্নত আদায় হয়ে যায়।
সপ্তম দিনই আকিকার সর্বোত্তম সময়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
كُلُّ غُلَامٍ رَهِينٌ بِعَقِيقَتِهِ، تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ السَّابِعِ، وَيُسَمَّى، وَيُحْلَقُ رَأْسُهُ
‘প্রত্যেক শিশু তার আকিকার সঙ্গে দায়বদ্ধ থাকে। জন্মের সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে পশু জবাই করা হবে, তার নাম রাখা হবে এবং মাথার চুল মুণ্ডন করা হবে।’ (তিরমিজি ১৫২২, আবু দাউদ ২৮৩৮)
আলেমরা বলেন, এই হাদিস আকিকার গুরুত্ব এবং এর প্রতি ইসলামের উৎসাহ স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। তাই বিশেষ কোনো ওজর না থাকলে সন্তানের জন্মের সপ্তম দিনেই আকিকা করা সর্বোত্তম।
সপ্তম দিনে না পারলে কী করবেন?
অনেকের ধারণা, সপ্তম দিনে আকিকা করতে না পারলে পরে আর তা আদায় করা যাবে না। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
تُذْبَحُ الْعَقِيقَةُ يَوْمَ السَّابِعِ، فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فَفِي أَرْبَعَ عَشْرَةَ، فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فَفِي إِحْدَى وَعِشْرِينَ
‘সপ্তম দিনে আকিকা করবে। সপ্তম দিনে সম্ভব না হলে চতুর্দশ দিনে করবে। তাও সম্ভব না হলে একুশতম দিনে করবে।’ (মুস্তাদরাকে হাকেম ৭৬৬৯)
ফকিহদের মতে, এসব সময়ও অতিক্রম হয়ে গেলে পরবর্তী যেকোনো দিন আকিকা করা বৈধ। তাই সন্তানের বয়স বেড়ে গেলেও সামর্থ্য হলে তার পক্ষ থেকে আকিকা করা যাবে।
সামর্থ্য না থাকলে কি গুনাহ হবে?
আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কেউ আকিকা করতে না পারলে তার কোনো গুনাহ হবে না। কারণ ইসলাম কখনো মানুষের সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব চাপিয়ে দেয় না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
‘আল্লাহ তাআলা কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৮৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন—
إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ
‘আমি যখন তোমাদের কোনো কাজের নির্দেশ দিই, তখন তোমরা সাধ্য অনুযায়ী তা পালন কর।’ (বুখারি ৭২৮৮, মুসলিম ১৩৩৭)
অতএব, সামর্থ্য না থাকলে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা সামর্থ্য দান করলে আকিকা করে নেওয়াই উত্তম।
ছেলে ও মেয়ের আকিকার বিধান
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ وُلِدَ لَهُ وَلَدٌ فَأَحَبَّ أَنْ يَنْسُكَ عَنْهُ، فَلْيَفْعَلْ، عَنِ الْغُلَامِ شَاتَانِ مُكَافِئَتَانِ، وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ
‘যার সন্তান জন্মগ্রহণ করে এবং সে যদি তার পক্ষ থেকে আকিকা করতে চায়, তবে সে যেন তা করে। ছেলের জন্য সমমানের দুটি ছাগল এবং মেয়ের জন্য একটি ছাগল।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক ৭৯৬১, আবু দাউদ ২৮৪২)
তবে অনেক আলেমের মতে, বিশেষ প্রয়োজন বা আর্থিক সামর্থ্য সীমিত থাকলে ছেলের পক্ষ থেকেও একটি পশু জবাই করলে আকিকার মূল সুন্নত আদায় হয়ে যায়।
কুরবানির সঙ্গে আকিকা করা যাবে কি?
অনেক সময় আলাদাভাবে আকিকার জন্য পশু জবাই করা সম্ভব হয় না। হানাফি মাজহাবের ফকিহদের মতে, সে ক্ষেত্রে কুরবানির গরুর নির্ধারিত অংশে আকিকার নিয়ত করলেও আকিকা আদায় হয়ে যায়। তবে সামর্থ্য থাকলে আকিকার জন্য পৃথক পশু জবাই করাই অধিক উত্তম ও ফজিলতপূর্ণ।
আকিকার গুরুত্ব ও তাৎপর্য
আকিকা শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সন্তানের জন্ম উপলক্ষে আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। একই সঙ্গে এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত একটি বরকতময় আমল, যা একজন মুসলমানের সুন্নতের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ।
তাই কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ে আকিকা করা সম্ভব না হলেও হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। সামর্থ্য হলে সুবিধাজনক সময়ে এই সুন্নত আদায় করে নেওয়াই উত্তম।
ইসলাম সহজ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং মানবকল্যাণমুখী একটি জীবনব্যবস্থা। আকিকার ক্ষেত্রেও শরিয়ত মানুষের সামর্থ্য ও বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। জন্মের সপ্তম দিন আকিকার জন্য সর্বোত্তম হলেও নির্ধারিত সময় অতিক্রম হয়ে গেলে এ সুন্নতের দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। আল্লাহ তাআলা যখন সামর্থ্য দান করবেন, তখনই সন্তানের পক্ষ থেকে আকিকা আদায় করা যেতে পারে।
আমাদের উচিত সুন্নতের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা রাখা, সামর্থ্য অনুযায়ী তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা এবং বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন, আমাদের সন্তানদের নেককার, দ্বীনদার ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী বানান। আমিন।
ইসলাম হাদিস আমল সুন্নত