ঢাকা ০৫:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
৫০ বছর পর পাকিস্তান থেকে স্বজনদের কাছে ফিরলেন পরী সন্ত্রাসী কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় আ.লীগের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ নেই: তথ্য উপদেষ্টা অবিলম্বে আওয়ামী লীগের বিচার শুরু করতে হবে: নাহিদ ইসলাম হুথি কারা? কেন তারা সৌদি আরবে হামলা চালাচ্ছে? নিজের বাড়ির জানালা সংস্কারে এভাবে অবহেলা করতেন? হামলার ভয়ে এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সৌদি যুবরাজ ড. ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে: তথ্য উপদেষ্টা জন্মদিনে গাড়ি উপহার দেন মা, সেই গাড়ি দিয়ে সড়কে ৩ জনের প্রাণ নিলেন ছেলে ইন্ডিয়া জোটের পদযাত্রায় দিল্লির রাজপথে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী বাংকারযুক্ত প্রাসাদে অবস্থান বদল সৌদি যুবরাজের!

মেহেদি দিয়ে চুল-দাড়ি কালো করার শরয়ি বিধান কী?

  • Tareq Jamil
  • আপডেট সময় : ১০:৫৭:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২৩৭ বার পড়া হয়েছে

ছবি: সংগৃহীত

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুল বা দাড়ি পেকে যাওয়া এক স্বাভাবিক ও অবধারিত প্রাকৃতিক নিয়ম। এই শুভ্রতা ঢাকতে অনেকেই নানা উপায় বেছে নেন।

বাজারে আজকাল অর্গানিক বা ন্যাচারাল হেয়ার কালারের বেশ প্রচলন রয়েছে। যেমন— মেহেদির সঙ্গে ইন্ডিগো পাউডার মিশিয়ে চুল কালো করা। তবে প্রশ্ন হলো— বার্ধক্যের কারণে পেকে যাওয়া চুল বা দাড়ি এসব প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে কুচকুচে কালো করা ইসলামে কতটা বৈধ? এই বিষয়ে শরিয়তের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও ফিকহি বিধান তুলে ধরা হলো—

বার্ধক্যের চুলে কালো রঙের নিষেধাজ্ঞা

বয়সের ভারে চুল কিংবা দাড়ি পেকে গেলে কৃত্রিম উপায়ে সম্পূর্ণ কালো খেজাব বা রং ব্যবহার করা ইসলামি শরিয়তে নিষিদ্ধ ও নাজায়েজ। রং তৈরির উপাদানটি ভেষজ কিংবা অর্গানিক— যেকোনো কিছুই হোক না কেন, চূড়ান্ত ফলাফল যদি খাঁটি কালো রূপ ধারণ করে, তবে তা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। সুন্নাহর নির্দেশনা হলো, পাকা চুল বা দাড়ির শুভ্রতা পরিবর্তন করতে হবে মেহেদি বা অন্য কোনো রঙে (যেমন— লালচে, হলুদ বা বাদামি), কিন্তু কুচকুচে কালো রং বর্জন করতে হবে।

এই বিষয়ে হাদিস শরিফে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে, হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—

أُتِيَ بِأَبِي قُحَافَةَ يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ وَرَأْسُهُ وَلِحْيَتُهُ كَالثَّغَامَةِ بَيَاضاً، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: «غَيِّرُوا هَذَا بِشَيْءٍ، وَاجْتَنِبُوا السَّوَادَ

‘মক্কা বিজয়ের দিন আবু কুহাফাকে (আবু বকর রা.-এর পিতা) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে আনা হলো। তখন তার মাথার চুল ও দাড়ি ‘সাগামা’ (এক প্রকার ধবধবে সাদা ফুল ও ফলযুক্ত উদ্ভিদ) উদ্ভিদের মতো একেবারে সাদা হয়ে গিয়েছিল। তা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করলেন, ‘এটি (সাদা চুল-দাড়ি) কোনো কিছু দ্বারা পরিবর্তন কর, তবে কালো রং ব্যবহার করা থেকে বিরত থাক।’ (মুসলিম ২১০২)

আরেকটি হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন—

يَكُونُ قَوْمٌ يَخْضِرُونَ فِي آخِرِ الزَّمَانِ بِالسَّوَادِ كَحَوَاصِلِ الْحَمَامِ، لَا يَريحُونَ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ

‘শেষ জামানায় কিছু লোক কবুতরের বুকের মতো কালো খেজাব ব্যবহার করবে। তারা কেয়ামতের দিন জান্নাতের সুবাসও পাবে না।’ (আবু দাউদ ৪২১২)

নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যের কারণ: প্রতারণা বর্জন

ইসলামের এই নিষেধাজ্ঞার হেকমত বা মূল কারণ হলো, নিজের প্রকৃত বয়স গোপন করে অন্যের সামনে নিজেকে যুবক হিসেবে প্রকাশ করা বা প্রতারণা করা। প্রসিদ্ধ ইসলামি স্কলার ইবনুল কায়্যিম (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন—

‘নিষিদ্ধ কালো খেজাব হচ্ছে এমন খেজাব, যা দ্বারা ধোঁকা দেওয়া উদ্দেশ্য থাকে। যেমন বৃদ্ধা মহিলা চুলে কালো খেজাব ব্যবহার করে স্বামীকে ধোঁকা দিল, একইভাবে বৃদ্ধ লোক কালো খেজাব ব্যবহার করে স্ত্রীকে ধোঁকা দিল। কারণ এটি সুস্পষ্ট প্রতারণা।’ (যাদুল মাআদ ৪/৩৬৮)

কম বয়সে চুল পেকে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিধান

তবে কোনো ব্যক্তির যদি বার্ধক্যের আগেই অসুস্থতা কিংবা শারীরবৃত্তীয় অন্য কোনো ব্যতিক্রমী কারণে কম বয়সে চুল পেকে যায়, সে ক্ষেত্রে কোনো কোনো ফকিহ ও তাবেঈর মতে কালো খেজাব ব্যবহারে কিছুটা শিথিলতা রয়েছে।

 

প্রসিদ্ধ তাবেয়ি ইমাম জুহরি (রহ.) বলেন— ‘যখন আমাদের চেহারা সতেজ ও তারুণ্যদীপ্ত ছিল, তখন আমরা কালো খেজাব ব্যবহার করতাম। কিন্তু যখন চেহারায় বলিরেখা পড়ে গেল এবং দাঁত নড়বড়ে হলো, তখন আমরা কালো খেজাব ছেড়ে দিয়েছি।’ (ফাতহুল বারি ১০/৩৬৭)

মেহেদির মিশ্রণ ব্যবহারের শরয়ি মাপকাঠি

ইন্ডিগো পাউডার ও মেহেদির মিশ্রণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো এর চূড়ান্ত রং।

  • নিষিদ্ধ রূপ: এই দুটি প্রাকৃতিক উপাদান মিশিয়ে চুলে দেওয়ার পর চুল যদি একেবারে খাঁটি ও প্রগাঢ় কালো হয়ে যায়, তবে বয়স্কদের জন্য তা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।
  • অনুমোদিত রূপ: মিশ্রণটির ফলে যদি চুলে কালোর পাশাপাশি লালচে, কালচে-বাদামি বা তামাটে রঙের সুন্দর আভা তৈরি হয় এবং তা দেখতে খাঁটি কালো না দেখায়, তবে তা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামে বার্ধক্যের নিদর্শনকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম উপায়ে বয়স্কদের কুচকুচে কালো চুল বা দাড়ি রাখার যে প্রবণতা, তা শরিয়তে নিষেধ করা হয়েছে যাতে ধোঁকা ও প্রতারণার পথ বন্ধ থাকে। তাই প্রাকৃতিকভাবে চুল রাঙানোর ক্ষেত্রে রঙের চূড়ান্ত রূপের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রতিটি মুমিনের জন্য জরুরি।

ইসলাম   হাদিস

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৫০ বছর পর পাকিস্তান থেকে স্বজনদের কাছে ফিরলেন পরী

মেহেদি দিয়ে চুল-দাড়ি কালো করার শরয়ি বিধান কী?

আপডেট সময় : ১০:৫৭:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুল বা দাড়ি পেকে যাওয়া এক স্বাভাবিক ও অবধারিত প্রাকৃতিক নিয়ম। এই শুভ্রতা ঢাকতে অনেকেই নানা উপায় বেছে নেন।

বাজারে আজকাল অর্গানিক বা ন্যাচারাল হেয়ার কালারের বেশ প্রচলন রয়েছে। যেমন— মেহেদির সঙ্গে ইন্ডিগো পাউডার মিশিয়ে চুল কালো করা। তবে প্রশ্ন হলো— বার্ধক্যের কারণে পেকে যাওয়া চুল বা দাড়ি এসব প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে কুচকুচে কালো করা ইসলামে কতটা বৈধ? এই বিষয়ে শরিয়তের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও ফিকহি বিধান তুলে ধরা হলো—

বার্ধক্যের চুলে কালো রঙের নিষেধাজ্ঞা

বয়সের ভারে চুল কিংবা দাড়ি পেকে গেলে কৃত্রিম উপায়ে সম্পূর্ণ কালো খেজাব বা রং ব্যবহার করা ইসলামি শরিয়তে নিষিদ্ধ ও নাজায়েজ। রং তৈরির উপাদানটি ভেষজ কিংবা অর্গানিক— যেকোনো কিছুই হোক না কেন, চূড়ান্ত ফলাফল যদি খাঁটি কালো রূপ ধারণ করে, তবে তা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। সুন্নাহর নির্দেশনা হলো, পাকা চুল বা দাড়ির শুভ্রতা পরিবর্তন করতে হবে মেহেদি বা অন্য কোনো রঙে (যেমন— লালচে, হলুদ বা বাদামি), কিন্তু কুচকুচে কালো রং বর্জন করতে হবে।

এই বিষয়ে হাদিস শরিফে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে, হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—

أُتِيَ بِأَبِي قُحَافَةَ يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ وَرَأْسُهُ وَلِحْيَتُهُ كَالثَّغَامَةِ بَيَاضاً، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: «غَيِّرُوا هَذَا بِشَيْءٍ، وَاجْتَنِبُوا السَّوَادَ

‘মক্কা বিজয়ের দিন আবু কুহাফাকে (আবু বকর রা.-এর পিতা) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে আনা হলো। তখন তার মাথার চুল ও দাড়ি ‘সাগামা’ (এক প্রকার ধবধবে সাদা ফুল ও ফলযুক্ত উদ্ভিদ) উদ্ভিদের মতো একেবারে সাদা হয়ে গিয়েছিল। তা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করলেন, ‘এটি (সাদা চুল-দাড়ি) কোনো কিছু দ্বারা পরিবর্তন কর, তবে কালো রং ব্যবহার করা থেকে বিরত থাক।’ (মুসলিম ২১০২)

আরেকটি হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন—

يَكُونُ قَوْمٌ يَخْضِرُونَ فِي آخِرِ الزَّمَانِ بِالسَّوَادِ كَحَوَاصِلِ الْحَمَامِ، لَا يَريحُونَ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ

‘শেষ জামানায় কিছু লোক কবুতরের বুকের মতো কালো খেজাব ব্যবহার করবে। তারা কেয়ামতের দিন জান্নাতের সুবাসও পাবে না।’ (আবু দাউদ ৪২১২)

নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যের কারণ: প্রতারণা বর্জন

ইসলামের এই নিষেধাজ্ঞার হেকমত বা মূল কারণ হলো, নিজের প্রকৃত বয়স গোপন করে অন্যের সামনে নিজেকে যুবক হিসেবে প্রকাশ করা বা প্রতারণা করা। প্রসিদ্ধ ইসলামি স্কলার ইবনুল কায়্যিম (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন—

‘নিষিদ্ধ কালো খেজাব হচ্ছে এমন খেজাব, যা দ্বারা ধোঁকা দেওয়া উদ্দেশ্য থাকে। যেমন বৃদ্ধা মহিলা চুলে কালো খেজাব ব্যবহার করে স্বামীকে ধোঁকা দিল, একইভাবে বৃদ্ধ লোক কালো খেজাব ব্যবহার করে স্ত্রীকে ধোঁকা দিল। কারণ এটি সুস্পষ্ট প্রতারণা।’ (যাদুল মাআদ ৪/৩৬৮)

কম বয়সে চুল পেকে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিধান

তবে কোনো ব্যক্তির যদি বার্ধক্যের আগেই অসুস্থতা কিংবা শারীরবৃত্তীয় অন্য কোনো ব্যতিক্রমী কারণে কম বয়সে চুল পেকে যায়, সে ক্ষেত্রে কোনো কোনো ফকিহ ও তাবেঈর মতে কালো খেজাব ব্যবহারে কিছুটা শিথিলতা রয়েছে।

 

প্রসিদ্ধ তাবেয়ি ইমাম জুহরি (রহ.) বলেন— ‘যখন আমাদের চেহারা সতেজ ও তারুণ্যদীপ্ত ছিল, তখন আমরা কালো খেজাব ব্যবহার করতাম। কিন্তু যখন চেহারায় বলিরেখা পড়ে গেল এবং দাঁত নড়বড়ে হলো, তখন আমরা কালো খেজাব ছেড়ে দিয়েছি।’ (ফাতহুল বারি ১০/৩৬৭)

মেহেদির মিশ্রণ ব্যবহারের শরয়ি মাপকাঠি

ইন্ডিগো পাউডার ও মেহেদির মিশ্রণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো এর চূড়ান্ত রং।

  • নিষিদ্ধ রূপ: এই দুটি প্রাকৃতিক উপাদান মিশিয়ে চুলে দেওয়ার পর চুল যদি একেবারে খাঁটি ও প্রগাঢ় কালো হয়ে যায়, তবে বয়স্কদের জন্য তা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।
  • অনুমোদিত রূপ: মিশ্রণটির ফলে যদি চুলে কালোর পাশাপাশি লালচে, কালচে-বাদামি বা তামাটে রঙের সুন্দর আভা তৈরি হয় এবং তা দেখতে খাঁটি কালো না দেখায়, তবে তা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামে বার্ধক্যের নিদর্শনকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম উপায়ে বয়স্কদের কুচকুচে কালো চুল বা দাড়ি রাখার যে প্রবণতা, তা শরিয়তে নিষেধ করা হয়েছে যাতে ধোঁকা ও প্রতারণার পথ বন্ধ থাকে। তাই প্রাকৃতিকভাবে চুল রাঙানোর ক্ষেত্রে রঙের চূড়ান্ত রূপের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রতিটি মুমিনের জন্য জরুরি।

ইসলাম   হাদিস