ঢাকা ০৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টিকলো না ট্রাম্পের ‘যুদ্ধ শেষ’ প্রতিশ্রুতি, গাজার ভবিষ্যৎ কী?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সবার মনে জেগেছিল এক নতুন আশার আলো—দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান এবং শান্তির সম্ভাবনা। কিন্তু সপ্তাহান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সেই আশাকে আবারও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

“নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক ভোর” হিসেবে ঘোষিত এই চুক্তি এখনো টিকে আছে বলে রোববার দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যদিও ইসরায়েল হামাসের ঘাঁটিতে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।

চুক্তির মধ্যস্থতাকারী ট্রাম্প হামাস নেতৃত্বকে দায়ী না করে বলেছেন, “কিছু বিদ্রোহী এর পেছনে আছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, হামাসের সঙ্গে বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা হোক—কঠোরভাবে, কিন্তু সঠিক উপায়ে।”

গাজার সিভিল ডিফেন্স জানায়, ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, তারা যুদ্ধবিরতি “পুনরায় কার্যকর করছে”, তবে “যেকোনো লঙ্ঘনের কঠোর জবাব দেওয়া হবে।” অন্যদিকে হামাস দাবি করেছে, তারা কোনো যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেনি; বরং ইসরায়েল “যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার অজুহাত তৈরি করছে।”

হামাসের শর্ত ও সীমিত প্রতিশ্রুতি

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ নাজ্জাল বলেছেন, তাদের প্রতিশ্রুতি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত সীমিত—এর পরের ধাপ নির্ভর করবে ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার “আশা ও সম্ভাবনা” তৈরির ওপর।

ট্রাম্প গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও মিসরে আকস্মিক সফর করে শার্ম আল-শেখ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করেন, যেখানে বিশ্বের বহু নেতা উপস্থিত ছিলেন।

কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। ইসরায়েল হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের শর্ত পূরণ না হলে সামরিক অভিযান আবার শুরু হবে। অন্যদিকে হামাস ইতোমধ্যে গাজার দখলকৃত এলাকাগুলোয় পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা শুরু করেছে।

মানবিক সহায়তা স্থগিত ও অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা

১৬ অক্টোবর উত্তেজনা বাড়ে, যখন ইসরায়েল জানায়, হামাস জিম্মিদের মৃতদেহ উদ্ধার করতে পারছে না; কারণ তাদের হাতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর পাল্টা ইসরায়েলি হামলায় গাজার ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। বিবিসির ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়।

ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে হামাস ২০ জন জীবিত জিম্মিকে মুক্তি দেয়, আর ইসরায়েল মুক্তি দেয় প্রায় ২ হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে।

এদিকে সাহায্য বন্ধ থাকায় হামাসের নিরাপত্তা বাহিনী আবার রাস্তায় নেমেছে, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে এবং “আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার” অভিযানে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছে।

অক্টোবরের মাঝামাঝি প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, হামাস যোদ্ধারা চোখ বাঁধা আটজনকে গুলি করে হত্যা করছে, যাদের “সহযোগী ও অপরাধী” হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

কেউ কেউ মাসব্যাপী বিশৃঙ্খলার পর এই কঠোর পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও অনেক বিশ্লেষকের মতে, এতে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ নাকি সাময়িক বিরতি?

উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতির সীমা পরীক্ষা করতে থাকায় অনেক বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্পের ঘোষিত “নতুন মধ্যপ্রাচ্য” আদৌ কোনো স্থায়ী শান্তির সূচনা কিনা, নাকি কেবল আরেকটি সাময়িক বিরতি।

ইউরেশিয়া গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য পরিচালক ফিরাস মাকসাদ বলেন, “শার্ম আল-শেখে গাজা শান্তি সম্মেলনে অংশ নেওয়া নেতারাও প্রশ্নে ভরপুর—এর পর কী হবে?”

তিনি সিএনএন-কে বলেন, “এখনো অনেক বিষয় পরিষ্কার নয়—বিশেষ করে যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামো কীভাবে কাজ করবে।”

তার মতে, সবকিছুই নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর—ওয়াশিংটনের চাপ, ইসরায়েলি নেতার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সামলানো, এবং হামাসের অস্ত্র না রেখেও প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর।

চুক্তির দ্বন্দ্ব ও ফিলিস্তিনিদের ভূমিকা

লন্ডনভিত্তিক কাউন্সিল ফর আরব-ব্রিটিশ আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের পরিচালক ক্রিস ডয়েল বলেন, “চুক্তিটি আসলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে—ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে। হামাস কেবল ফিলিস্তিনিদের পক্ষে স্বাক্ষর করবে, অথচ তাদের ভবিষ্যতে কোনো ভূমিকা রাখার অনুমতি নেই—এটি সরাসরি দ্বন্দ্ব।”

তার মতে, টেকসই সমাধান সম্ভব শুধুমাত্র তখনই, যখন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

তিনি বলেন, “সব ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দল একমত যে পুনর্গঠন ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বেই হতে হবে, আন্তর্জাতিক সহায়তা ও তহবিলের সহযোগিতায়।”

ডয়েলের মতে, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি হলো ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব শাসন ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, যা দুই রাষ্ট্র সমাধানের দিকেই ইঙ্গিত করে।

ইরান, হিজবুল্লাহ ও আঞ্চলিক অস্থিরতা

অন্যান্য বিশ্লেষকরা বলছেন, শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অসম চাপ—যেখানে হামাসের ওপর চাপ থাকলেও ইসরায়েলের ওপর তুলনামূলকভাবে কম।

ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ফেলো মুহাম্মদ শেহাদা বলেন, “চুক্তি বিলম্বিত হওয়ার কারণ ছিল নেতানিয়াহুর ওপর যথেষ্ট চাপ না থাকা। হামাস প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিল—গাজায়, কাতারে, তুরস্কে—কিন্তু ইসরায়েলকে কার্যত ছাড় দেওয়া হয়েছিল।”

তিনি বলেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনার কেবল প্রথম ধাপই এখন কার্যকর হয়েছে। সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলো—হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা—এখনো অমীমাংসিত।

অন্যদিকে হামাস ও হিজবুল্লাহ দু’টোই অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। হামাসের এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেছেন, “নিরস্ত্রীকরণ আলোচনার বিষয় নয়।”

ট্রাম্প বলেছেন, “যদি হামাস অস্ত্র না ফেলে, আমরা তা বলপূর্বক করব—প্রয়োজনে সহিংসভাবেও।”

মাকসাদের বিশ্লেষণে, হামাস হয়তো প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরে রাজি, কিন্তু অস্ত্র ছাড়বে না—যেমনটি দীর্ঘদিন লেবাননে হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে দেখা গেছে।

এখনো অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

লেবাননে হিজবুল্লাহ এখনো নিরস্ত্রীকরণে রাজি নয়, যদিও দেশটির সরকার মার্কিন চাপের মুখে বছরের শেষে সব অস্ত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা করেছে।

ডয়েল বলেন, “এখন মধ্যপ্রাচ্য শান্তির পথে—এ কথা বলা একেবারেই সময়ের আগে। ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই শান্তির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে—এ দাবি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত।”

তিনি আরও বলেন, “অঞ্চলে এখনো তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে—বিশেষ করে পশ্চিম তীরে, যেখানে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ৯৯৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।”

বর্তমান বাস্তবতায়, গাজায় যুদ্ধবিরতি হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিয়েছে, কিন্তু হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, প্রশাসন, পুনর্গঠন ও ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় অধিকার—এসব মৌলিক প্রশ্ন এখনো অনুত্তরিত।

ট্রাম্পের “নতুন মধ্যপ্রাচ্য” সত্যিই কি স্থায়ী শান্তির সূচনা, নাকি কেবল ধ্বংসস্তূপের মাঝে ক্ষণিকের নীরবতা—এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: আরব নিউজ

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হাসিনাকে ফেরত না দিয়ে ভারত চক্রান্ত করছে: রিজভী

টিকলো না ট্রাম্পের ‘যুদ্ধ শেষ’ প্রতিশ্রুতি, গাজার ভবিষ্যৎ কী?

আপডেট সময় : ০৪:৫৩:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সবার মনে জেগেছিল এক নতুন আশার আলো—দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান এবং শান্তির সম্ভাবনা। কিন্তু সপ্তাহান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সেই আশাকে আবারও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

“নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক ভোর” হিসেবে ঘোষিত এই চুক্তি এখনো টিকে আছে বলে রোববার দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যদিও ইসরায়েল হামাসের ঘাঁটিতে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।

চুক্তির মধ্যস্থতাকারী ট্রাম্প হামাস নেতৃত্বকে দায়ী না করে বলেছেন, “কিছু বিদ্রোহী এর পেছনে আছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, হামাসের সঙ্গে বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা হোক—কঠোরভাবে, কিন্তু সঠিক উপায়ে।”

গাজার সিভিল ডিফেন্স জানায়, ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, তারা যুদ্ধবিরতি “পুনরায় কার্যকর করছে”, তবে “যেকোনো লঙ্ঘনের কঠোর জবাব দেওয়া হবে।” অন্যদিকে হামাস দাবি করেছে, তারা কোনো যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেনি; বরং ইসরায়েল “যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার অজুহাত তৈরি করছে।”

হামাসের শর্ত ও সীমিত প্রতিশ্রুতি

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ নাজ্জাল বলেছেন, তাদের প্রতিশ্রুতি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত সীমিত—এর পরের ধাপ নির্ভর করবে ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার “আশা ও সম্ভাবনা” তৈরির ওপর।

ট্রাম্প গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও মিসরে আকস্মিক সফর করে শার্ম আল-শেখ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করেন, যেখানে বিশ্বের বহু নেতা উপস্থিত ছিলেন।

কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। ইসরায়েল হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের শর্ত পূরণ না হলে সামরিক অভিযান আবার শুরু হবে। অন্যদিকে হামাস ইতোমধ্যে গাজার দখলকৃত এলাকাগুলোয় পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা শুরু করেছে।

মানবিক সহায়তা স্থগিত ও অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা

১৬ অক্টোবর উত্তেজনা বাড়ে, যখন ইসরায়েল জানায়, হামাস জিম্মিদের মৃতদেহ উদ্ধার করতে পারছে না; কারণ তাদের হাতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর পাল্টা ইসরায়েলি হামলায় গাজার ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। বিবিসির ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়।

ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে হামাস ২০ জন জীবিত জিম্মিকে মুক্তি দেয়, আর ইসরায়েল মুক্তি দেয় প্রায় ২ হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে।

এদিকে সাহায্য বন্ধ থাকায় হামাসের নিরাপত্তা বাহিনী আবার রাস্তায় নেমেছে, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে এবং “আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার” অভিযানে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছে।

অক্টোবরের মাঝামাঝি প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, হামাস যোদ্ধারা চোখ বাঁধা আটজনকে গুলি করে হত্যা করছে, যাদের “সহযোগী ও অপরাধী” হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

কেউ কেউ মাসব্যাপী বিশৃঙ্খলার পর এই কঠোর পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও অনেক বিশ্লেষকের মতে, এতে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ নাকি সাময়িক বিরতি?

উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতির সীমা পরীক্ষা করতে থাকায় অনেক বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্পের ঘোষিত “নতুন মধ্যপ্রাচ্য” আদৌ কোনো স্থায়ী শান্তির সূচনা কিনা, নাকি কেবল আরেকটি সাময়িক বিরতি।

ইউরেশিয়া গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য পরিচালক ফিরাস মাকসাদ বলেন, “শার্ম আল-শেখে গাজা শান্তি সম্মেলনে অংশ নেওয়া নেতারাও প্রশ্নে ভরপুর—এর পর কী হবে?”

তিনি সিএনএন-কে বলেন, “এখনো অনেক বিষয় পরিষ্কার নয়—বিশেষ করে যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামো কীভাবে কাজ করবে।”

তার মতে, সবকিছুই নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর—ওয়াশিংটনের চাপ, ইসরায়েলি নেতার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সামলানো, এবং হামাসের অস্ত্র না রেখেও প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর।

চুক্তির দ্বন্দ্ব ও ফিলিস্তিনিদের ভূমিকা

লন্ডনভিত্তিক কাউন্সিল ফর আরব-ব্রিটিশ আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের পরিচালক ক্রিস ডয়েল বলেন, “চুক্তিটি আসলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে—ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে। হামাস কেবল ফিলিস্তিনিদের পক্ষে স্বাক্ষর করবে, অথচ তাদের ভবিষ্যতে কোনো ভূমিকা রাখার অনুমতি নেই—এটি সরাসরি দ্বন্দ্ব।”

তার মতে, টেকসই সমাধান সম্ভব শুধুমাত্র তখনই, যখন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

তিনি বলেন, “সব ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দল একমত যে পুনর্গঠন ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বেই হতে হবে, আন্তর্জাতিক সহায়তা ও তহবিলের সহযোগিতায়।”

ডয়েলের মতে, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি হলো ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব শাসন ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, যা দুই রাষ্ট্র সমাধানের দিকেই ইঙ্গিত করে।

ইরান, হিজবুল্লাহ ও আঞ্চলিক অস্থিরতা

অন্যান্য বিশ্লেষকরা বলছেন, শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অসম চাপ—যেখানে হামাসের ওপর চাপ থাকলেও ইসরায়েলের ওপর তুলনামূলকভাবে কম।

ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ফেলো মুহাম্মদ শেহাদা বলেন, “চুক্তি বিলম্বিত হওয়ার কারণ ছিল নেতানিয়াহুর ওপর যথেষ্ট চাপ না থাকা। হামাস প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিল—গাজায়, কাতারে, তুরস্কে—কিন্তু ইসরায়েলকে কার্যত ছাড় দেওয়া হয়েছিল।”

তিনি বলেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনার কেবল প্রথম ধাপই এখন কার্যকর হয়েছে। সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলো—হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা—এখনো অমীমাংসিত।

অন্যদিকে হামাস ও হিজবুল্লাহ দু’টোই অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। হামাসের এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেছেন, “নিরস্ত্রীকরণ আলোচনার বিষয় নয়।”

ট্রাম্প বলেছেন, “যদি হামাস অস্ত্র না ফেলে, আমরা তা বলপূর্বক করব—প্রয়োজনে সহিংসভাবেও।”

মাকসাদের বিশ্লেষণে, হামাস হয়তো প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরে রাজি, কিন্তু অস্ত্র ছাড়বে না—যেমনটি দীর্ঘদিন লেবাননে হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে দেখা গেছে।

এখনো অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

লেবাননে হিজবুল্লাহ এখনো নিরস্ত্রীকরণে রাজি নয়, যদিও দেশটির সরকার মার্কিন চাপের মুখে বছরের শেষে সব অস্ত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা করেছে।

ডয়েল বলেন, “এখন মধ্যপ্রাচ্য শান্তির পথে—এ কথা বলা একেবারেই সময়ের আগে। ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই শান্তির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে—এ দাবি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত।”

তিনি আরও বলেন, “অঞ্চলে এখনো তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে—বিশেষ করে পশ্চিম তীরে, যেখানে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ৯৯৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।”

বর্তমান বাস্তবতায়, গাজায় যুদ্ধবিরতি হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিয়েছে, কিন্তু হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, প্রশাসন, পুনর্গঠন ও ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় অধিকার—এসব মৌলিক প্রশ্ন এখনো অনুত্তরিত।

ট্রাম্পের “নতুন মধ্যপ্রাচ্য” সত্যিই কি স্থায়ী শান্তির সূচনা, নাকি কেবল ধ্বংসস্তূপের মাঝে ক্ষণিকের নীরবতা—এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: আরব নিউজ