ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি হলো রপ্তানির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির জন্য খোলা একটি দ্বিতীয় এলসি, যার মাধ্যমে ব্যাংক রপ্তানিকারকদের অর্থায়ন সহায়তা দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব এলসির বিপরীতে আমদানি করা কাঁচামাল রপ্তানি শিল্পে ব্যবহারের কোনো প্রমাণ নেই। বরং বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স ও ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধায় আনা পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে কর ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বছরের পর বছর এই অপরাধে সহযোগিতা করেছে। কোনো ক্ষেত্রেই শাখাটি বাংলাদেশ ব্যাংককে তথ্য দেয়নি।”
এতে আরও বলা হয়, একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রপ্তানি আদেশ ও এলসির বিপরীতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে, শাখাটি এসব লেনদেনে যথাযথ যাচাই-বাছাই করেনি এবং শাখা কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই অনিয়মগুলো সংঘটিত হয়েছে।
১০ বছর একই শাখায় ম্যানেজার
প্রতিবেদনে বলা হয়, অনিয়মের পুরো সময়জুড়ে মো. শহীদ হাসান মল্লিক প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন। ব্যাংকিং নীতিমালা ভঙ্গ করে তিনি একই শাখায় টানা ১০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া আরও ২৪ কর্মকর্তা নিয়ম ভেঙে দীর্ঘ সময় একই শাখায় কর্মরত ছিলেন।
বারবার চেষ্টা করেও শহীদ হাসান মল্লিকের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনজুর মফিজ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, তিনি গত ১৬ এপ্রিল দায়িত্ব নিয়েছেন, তাই অডিট প্রতিবেদন পর্যালোচনা ছাড়া মন্তব্য করতে পারছেন না।
তিনি জানান, প্রধান কার্যালয় ও কয়েকটি শাখায় ফরেনসিক অডিট চলছে এবং নারায়ণগঞ্জ শাখার জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “শাখা ব্যবস্থাপকসহ জড়িতদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে জানানো হয়েছে। মামলার প্রক্রিয়াও চলছে।”
কেন দেরি হলো ব্যবস্থায়?
বাংলাদেশ ব্যাংক যখন ২০২৩ সালের মে মাসে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে, তখন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সাবেক এইচবিএম ইকবাল সদস্য ছিলেন।
১৯৯৯ সালে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই দশকের বেশি সময় ইকবাল পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল ব্যাংকটি এবং এইচবিএম ইকবাল চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করেন।
এর প্রায় তিন বছর পর, চলতি বছরের মার্চে নারায়ণগঞ্জ শাখার এডি লাইসেন্স বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “প্রতিবেদন আগে প্রস্তুত হলেও তৎকালীন বিভিন্ন চাপের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থা নিতে পারেনি।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, এডি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে এবং “দেরিতে হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, “সে সময় একজন প্রভাবশালী চেয়ারম্যান থাকায় বাহ্যিক প্রভাব কাজ করেছে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।”
‘অনেক রপ্তানিকারক হয়তো জানেনই না তাদের নামে এলসি খোলা হয়েছে’
তদন্তে নাম আসা ২৯ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মোহাম্মদ হাতেমের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
হাতেম বলেন, প্রিমিয়ার ব্যাংকের অনিয়ম তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “ব্যাংকের যোগসাজশেই এসব অনিয়ম হয়েছে। প্রকৃত রপ্তানির তুলনায় অনেক বেশি ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়েছে।”
তার অভিযোগ, এলসি লেনদেনের সময় প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ব্যাংক দেয়নি, বরং দায় রপ্তানিকারকদের ওপর চাপিয়েছে।
“আমরা কাগজপত্র চাইলেও ব্যাংক দেয়নি,” বলেন তিনি। “ডকুমেন্টের বিপরীতে অর্থ আটকে রেখে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “কীভাবে বা কখন এসব দায় সৃষ্টি হয়েছে, আমরা জানি না। ব্যাংক ভুয়া রপ্তানি আদেশ ব্যবহার করে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলেছে এবং কখনো কখনো অন্য রপ্তানি আয়ের অর্থ আটকে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে স্বাক্ষর নিয়েছে।”
তার দাবি, অনেক গার্মেন্টস রপ্তানিকারক হয়তো জানেনই না যে তাদের নামে এমন এলসি খোলা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে আগামী সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা হবে বলেও জানান তিনি।
‘শুধু লাইসেন্স বাতিল যথেষ্ট নয়’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব বলেন, নগদ প্রণোদনা বা ভর্তুকি নেওয়ার উদ্দেশ্য থেকেও এসব অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, “প্রণোদনা দাবি করা হলেও বাস্তবে কোনো রপ্তানি হয়নি। অধিকাংশ ট্রেড ফাইন্যান্স অনিয়ম ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমেই হয়। তাই শুধু লাইসেন্স বাতিল যথেষ্ট নয়।”
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের তৎকালীন বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার সদস্যদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি এসব লেনদেনে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কঠোর নজরদারিতে আনতে হবে।
সূত্র: টিবিএস নিউজ