বাংলাদেশের ইতিহাসে ধর্মীয় শিক্ষা ও মুক্তচেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক শহীদ আল্লামা আবদুর রহমান কাশগরী। তিনি ছিলেন একাধারে ইসলামি চিন্তাবিদ, শিক্ষক, লেখক ও দেশপ্রেমিক।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে শহীদ হয়ে দেশের প্রতি আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন আবদুর রহমান কাশগরী। আজও ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদরাসায় তার নামে প্রতিষ্ঠিত ‘আবদুর রহমান কাশগরী হল’ মহান এই শিক্ষাবিদের স্মৃতিকে ধারণ করে রেখেছে।
শৈশব ও প্রাথমিক জীবন
১৯১২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তুর্কিস্তানের (বর্তমান রাশিয়া) কাশগর নগরে জন্মগ্রহণ করেন আল্লামা আবদুর রহমান কাশগরী। তার বাবা ছিলেন একজন প্রভাবশালী সামন্ত শাসক। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী ও অনুসন্ধানী প্রকৃতির ছিলেন।
কিন্তু ইতিহাসের এক ভয়াল অধ্যায় পাল্টে দেয় আবদুর রহমান কাশগরীর জীবন। কমিউনিস্ট বিপ্লবের সময় তুর্কিস্তানে নির্যাতন ও গণহত্যা শুরু হলে আত্মরক্ষার জন্য যখন মানুষ দলে দলে দেশ ছাড়তে শুরু করে, তখন তিনি তার মাকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা দেন। দুর্ভাগ্যবশত, পথিমধ্যে মাকে হারিয়ে ফেলেন তিনি।
শিক্ষাজীবন ও পাণ্ডিত্য
অকুল পাথারে একা হয়ে পড়লেও কাশগরী হাল ছাড়েননি। পরে তিনি ভারতের লখনৌর বিখ্যাত ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামার এতিমখানায় আশ্রয় পান। সেখানেই তিনি ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষায় নিজেকে গড়ে তোলেন। ১৯৩১ সালে কাশগরী প্রথম শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং তার অসাধারণ পারদর্শিতা দেখে কর্তৃপক্ষ তাকে নদওয়ার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। সেখানে তিনি আরবি ভাষা ও সাহিত্য পড়াতেন এবং ইসলামি চিন্তাধারায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনেন।
কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় যোগদান
১৯৩৮ সালে তৎকালীন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক নদওয়াতুল উলামা সফরে গেলে আল্লামা কাশগরীর পাণ্ডিত্য ও বক্তৃতায় মুগ্ধ হন। তিনি কাশগরীকে কলকাতার ঐতিহাসিক মাদরাসা-ই-আলিয়ায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব দেন। কাশগরী উসুলে ফিকহ (ইসলামি আইনতত্ত্ব) বিষয়ের অধ্যাপক হিসেবে সেখানে যোগ দেন এবং ইসলামি উচ্চশিক্ষায় নবজাগরণ ঘটান।
দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে কলকাতার আলিয়া মাদরাসা ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। তখন মাদরাসার লাইব্রেরির দায়িত্ব কাশগরীর হাতে দেওয়া হয়। ১৯৫৬ সালে তিনি সহকারী হেড মাওলানা ও ১৯৬৯ সালে হেড মাওলানা পদে উন্নীত হন। শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি ইসলামি চিন্তা, নৈতিকতা ও শিক্ষা সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
জীবন ও কর্ম
ঢাকার আলিয়া মাদরাসার অধ্যাপক মাওলানা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, জীবন ও কর্মের প্রতিটি অধ্যায়ে আল্লামা কাশগরী ছিলেন এক আদর্শ শিক্ষক ও নির্ভীক চিন্তাবিদ। তার মতে, কাশগরী ছিলেন এমন এক আলেম, যিনি জ্ঞানকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখতেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও শাহাদাত
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি সেনারা দেশের প্রগতিশীল আলেম, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। আল্লামা কাশগরীও তাদের হাতে আটক হন। মুক্তিকামী চেতনা ও দেশের স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকারের কারণেই তাকে হত্যা করা হয় বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা। তার শাহাদাত বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের এক শোকাবহ অধ্যায় হয়ে আছে।
এক সময়ের নিরহংকার শিক্ষক কাশগরী, যিনি শুধু জ্ঞান বিতরণ করতেন—তাকেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয় সেই জ্ঞানের শক্তিকে নিবারণের জন্য।
আলিয়া মাদরাসায় তার স্মৃতি
আল্লামা কাশগরী দীর্ঘদিন ঢাকার আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন জ্ঞানের আলোকবর্তিকা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। তার অবদান ও ত্যাগের স্মরণে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ আবাসিক একটি হলের নামকরণ করে ‘আবদুর রহমান কাশগরী হল’ রাখে। হলটি আজও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও আত্মত্যাগের শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়।
আলিয়া মাদরাসার এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা গর্বিত যে এমন একজন শহীদের নামে আমাদের হলের নামকরণ করা হয়েছে। তার জীবন আমাদের অনুপ্রাণিত করে সততা ও ন্যায়ের পথে।’
তাফসির ও হাদিস বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আবদুর রহমান কাশগরী শেখান, জ্ঞান কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে না। তিনি ছিলেন জ্ঞানের সৈনিক। আলেম সমাজও মুক্তিযুদ্ধের শহীদ হতে পারে— তিনি এই সত্যের জীবন্ত উদাহরণ।’
আল্লামা কাশগরী ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি জ্ঞানের আলো দিয়ে সমাজকে আলোকিত করেছিলেন এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করেছেন। তার জীবন আমাদের শেখায়— সত্য, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোই প্রকৃত শিক্ষার লক্ষ্য।
ঢাকার আলিয়া মাদরাসার ‘আবদুর রহমান কাশগরী হল’ আজও সেই চেতনার প্রতীক হয়ে শিক্ষার্থীদের মনে জাগিয়ে রেখেছে দেশপ্রেম ও ত্যাগের অম্লান স্মৃতি।
চেতনায়২৪ ডেস্ক : 


































