ঢাকা ০৬:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৭১ ইস্যুতে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চেয়েছিল পাকিস্তান, ইতিহাস কী বলে?

  • চেতনায়২৪ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৪:২৭:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৫
  • ৩২০ বার পড়া হয়েছে

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আজও বাঙালির হৃদয়ে তীব্র ব্যথার সৃষ্টিকরে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যখন নিজেদের অধিকারের দাবিতে সড়কে নেমেছিল, তখন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নির্মম দমন-পীড়ন চালায়। গণহত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও বেয়নেটের আঘাতের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের ভয়াবহ অধ্যায় রচনা করে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতা অর্জন হয়। সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ।

সম্প্রতি ঢাকা সফরে এসে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন। তিনি বলেন, একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তান দুইবার ক্ষমা চেয়েছে। আর এ বিষয়ে তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ‘দুইবারই নিষ্পত্তি’ হয়েছে।

ইসহাক দার বলেন, প্রথমবার বিষয়টির নিষ্পত্তি হয় ১৯৭৪ সালে, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে। দ্বিতীয়বার, বিষয়টি সমাধান করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ। তিনি ঢাকায় এসে প্রকাশ্যে, খোলামনে দুঃখপ্রকাশ করেন।

তার মতে, এই দুটি ঘটনা পাকিস্তানের পক্ষ থেকে যথেষ্ট স্পষ্ট বার্তা দেয়। ইসহাক দার আরও বলেন, ১৯৭৪ সালের চুক্তিটি দুই দেশের জন্য ঐতিহাসিক দলিল। বিষয়টি এখন অতীত, আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই।

তবে বাংলাদেশ এখনও এই ইস্যুকে পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে মনে করে না। অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য সেই ইঙ্গিতই বহন করে। তিনি বলেন, আমরা বৈঠকে অমীমাংসিত ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়েছি। তবে আমরা এবং পাকিস্তান উভয়েই এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা চালিয়ে যেতে রাজি হয়েছি।

শেষ নবীর নামে, আমি তোমাদের কাছে তোবা করছি।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো

তথ্য বলছে, ১৯৭৪ সালের ১০ এপ্রিল দিল্লিতে একটি ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান অংশ নেয়। ওই চুক্তির মাধ্যমে ‘১৯৭১ সালের যেকোনো অপরাধের জন্য গভীরভাবে দুঃখপ্রকাশ’ করে পাকিস্তান। সে সময় চুক্তিতে ১৯৫ পাকিস্তানি সেনার বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগকে ‘নিন্দনীয় অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর মানবিক বিবেচনায় তাদের বিচার স্থগিত করা হয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো সে সময় একটি বার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘অতীত ভুলে নতুন করে শুরু করুন।’ শেখ মুজিবুর রহমানও সেই মুহূর্তে একই আহ্বান জানান। যদিও সেই চুক্তিতে ‘ক্ষমা চাওয়া’ কথাটি ব্যবহার হয়নি।

একই বছর, অর্থাৎ ১৯৭৪ সালের ২৯ জুন। শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘শেষ নবীর নামে, আমি তোমাদের কাছে তোবা করছি।’

সেই বক্তব্যে তিনি ১৯৭১ সালের দমন-পীড়নের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন। ভুট্টো বলেন, পাকিস্তান যে দুঃখজনক অধ্যায় তৈরি করেছিল, তার জন্য তিনি অনুতপ্ত। তবে একই সঙ্গে তিনি দায় চাপান তৎকালীন সেনাশাসক আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের স্বৈরশাসনের ওপর।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান এখন থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। বরং দুই দেশ যেন পুনর্মিলনের পথে এগিয়ে যায়, সেই আশাবাদ জানান। তথ্যমতে—সেদিন ভুট্টোর কথায় নীরব হয়ে গিয়েছিল পুরো হলরুম। বাংলাদেশের অনেক নেতা-মন্ত্রীকে চোখের পানি মুছতে দেখা যায়।

এরপর ৭১ ইস্যুতে ২০০২ সালে আবারও দুঃখপ্রকাশ করে পাকিস্তান। সে বছরের ২৯ জুলাই বাংলাদেশ সফরে আসেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। ঢাকায় এক ভাষণে তিনি ১৯৭১ সালের ট্র্যাজেডির জন্য গভীর দুঃখপ্রকাশ করেন।

মোশাররফ বলেন, ১৯৭১ সালের ঘটনাবলীর যন্ত্রণায় পাকিস্তানের ভাই-বোনরাও সমানভাবে ব্যথিত। তাই অতীতের দুঃখ ভুলে দুই দেশের মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ার আহ্বান জানান তিনি।

সেদিন তার ভাষ্যে উঠে আসে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা। তিনি বলেন, আমরা অতীত ভুলে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাব। তার মতে— বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সংস্কৃতি, শিক্ষা, অর্থনীতি ও সমাজের নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব।

সে দিনের ভাষণে দুই দেশের জনগণের সম্পর্ককে ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘যেখানে অতীত প্রজন্ম কিছু সেতু ভেঙে দিয়েছে, সেখানে নতুন প্রজন্ম নতুন সেতু গড়বে।’ পারভেজ মেশাররফের সেই সফরকে পাকিস্তান বর্ণনা করেছিল ‘শান্তি ও পুনর্মিলনের প্রয়াস’ হিসেবে।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

স্ত্রী দেখতে ‘সুন্দর’ না হওয়ায় তাকে তালাক দেওয়া যাবে?

৭১ ইস্যুতে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চেয়েছিল পাকিস্তান, ইতিহাস কী বলে?

আপডেট সময় : ০৪:২৭:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৫

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আজও বাঙালির হৃদয়ে তীব্র ব্যথার সৃষ্টিকরে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যখন নিজেদের অধিকারের দাবিতে সড়কে নেমেছিল, তখন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নির্মম দমন-পীড়ন চালায়। গণহত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও বেয়নেটের আঘাতের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের ভয়াবহ অধ্যায় রচনা করে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতা অর্জন হয়। সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ।

সম্প্রতি ঢাকা সফরে এসে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন। তিনি বলেন, একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তান দুইবার ক্ষমা চেয়েছে। আর এ বিষয়ে তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ‘দুইবারই নিষ্পত্তি’ হয়েছে।

ইসহাক দার বলেন, প্রথমবার বিষয়টির নিষ্পত্তি হয় ১৯৭৪ সালে, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে। দ্বিতীয়বার, বিষয়টি সমাধান করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ। তিনি ঢাকায় এসে প্রকাশ্যে, খোলামনে দুঃখপ্রকাশ করেন।

তার মতে, এই দুটি ঘটনা পাকিস্তানের পক্ষ থেকে যথেষ্ট স্পষ্ট বার্তা দেয়। ইসহাক দার আরও বলেন, ১৯৭৪ সালের চুক্তিটি দুই দেশের জন্য ঐতিহাসিক দলিল। বিষয়টি এখন অতীত, আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই।

তবে বাংলাদেশ এখনও এই ইস্যুকে পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে মনে করে না। অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য সেই ইঙ্গিতই বহন করে। তিনি বলেন, আমরা বৈঠকে অমীমাংসিত ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়েছি। তবে আমরা এবং পাকিস্তান উভয়েই এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা চালিয়ে যেতে রাজি হয়েছি।

শেষ নবীর নামে, আমি তোমাদের কাছে তোবা করছি।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো

তথ্য বলছে, ১৯৭৪ সালের ১০ এপ্রিল দিল্লিতে একটি ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান অংশ নেয়। ওই চুক্তির মাধ্যমে ‘১৯৭১ সালের যেকোনো অপরাধের জন্য গভীরভাবে দুঃখপ্রকাশ’ করে পাকিস্তান। সে সময় চুক্তিতে ১৯৫ পাকিস্তানি সেনার বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগকে ‘নিন্দনীয় অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর মানবিক বিবেচনায় তাদের বিচার স্থগিত করা হয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো সে সময় একটি বার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘অতীত ভুলে নতুন করে শুরু করুন।’ শেখ মুজিবুর রহমানও সেই মুহূর্তে একই আহ্বান জানান। যদিও সেই চুক্তিতে ‘ক্ষমা চাওয়া’ কথাটি ব্যবহার হয়নি।

একই বছর, অর্থাৎ ১৯৭৪ সালের ২৯ জুন। শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘শেষ নবীর নামে, আমি তোমাদের কাছে তোবা করছি।’

সেই বক্তব্যে তিনি ১৯৭১ সালের দমন-পীড়নের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন। ভুট্টো বলেন, পাকিস্তান যে দুঃখজনক অধ্যায় তৈরি করেছিল, তার জন্য তিনি অনুতপ্ত। তবে একই সঙ্গে তিনি দায় চাপান তৎকালীন সেনাশাসক আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের স্বৈরশাসনের ওপর।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান এখন থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। বরং দুই দেশ যেন পুনর্মিলনের পথে এগিয়ে যায়, সেই আশাবাদ জানান। তথ্যমতে—সেদিন ভুট্টোর কথায় নীরব হয়ে গিয়েছিল পুরো হলরুম। বাংলাদেশের অনেক নেতা-মন্ত্রীকে চোখের পানি মুছতে দেখা যায়।

এরপর ৭১ ইস্যুতে ২০০২ সালে আবারও দুঃখপ্রকাশ করে পাকিস্তান। সে বছরের ২৯ জুলাই বাংলাদেশ সফরে আসেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। ঢাকায় এক ভাষণে তিনি ১৯৭১ সালের ট্র্যাজেডির জন্য গভীর দুঃখপ্রকাশ করেন।

মোশাররফ বলেন, ১৯৭১ সালের ঘটনাবলীর যন্ত্রণায় পাকিস্তানের ভাই-বোনরাও সমানভাবে ব্যথিত। তাই অতীতের দুঃখ ভুলে দুই দেশের মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ার আহ্বান জানান তিনি।

সেদিন তার ভাষ্যে উঠে আসে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা। তিনি বলেন, আমরা অতীত ভুলে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাব। তার মতে— বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সংস্কৃতি, শিক্ষা, অর্থনীতি ও সমাজের নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব।

সে দিনের ভাষণে দুই দেশের জনগণের সম্পর্ককে ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘যেখানে অতীত প্রজন্ম কিছু সেতু ভেঙে দিয়েছে, সেখানে নতুন প্রজন্ম নতুন সেতু গড়বে।’ পারভেজ মেশাররফের সেই সফরকে পাকিস্তান বর্ণনা করেছিল ‘শান্তি ও পুনর্মিলনের প্রয়াস’ হিসেবে।