২০২৪ সালের ১৪ই জুলাই, এক নির্ঘুম রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জেগে উঠেছিল এক অভূতপূর্ব গণবিদ্রোহের ঢেউয়ে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের শান্তিপূর্ণ দাবি যখন শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে, ঠিক তখনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক অবমাননাকর মন্তব্য সেই আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছিল। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের সন্তান’ বলে আখ্যায়িত করার পর তাদের বুকে জমে থাকা ক্ষোভ মুহূর্তেই পরিণত হয় গণরোষে।
সেই রাতেই হাজারো শিক্ষার্থী স্লোগান তোলে, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার; চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’। যা কেবল একটি স্লোগান ছিল না, ছিল ১৬ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে এক তীব্র ঘৃণা ও প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ।
পরের দিন, এই প্রতিবাদকে স্তব্ধ করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্দেশে বর্বর হামলা চালানো হয়। ভাড়াটে সন্ত্রাসী ও নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠনের ক্যাডারেরা নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, রক্তাক্ত করে শত শত তরুণ-তরুণীকে। কিন্তু এই সহিংসতা আন্দোলনকে দমাতে পারেনি, বরং তা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের আরও বড় অনুপ্রেরণা।
১৭ জুলাই, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর টিয়ার গ্যাস ও কঠোর দমন-পীড়নের মধ্যেও একদল নারী শিক্ষার্থী বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল, পিছু হটেনি। তাদের অটল সাহস আর প্রত্যয় যেন পুরো জাতির চোখে-মুখে সাহস আর প্রেরণা ছড়িয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত এক মহাকাব্যিক গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।
চব্বিশের গণ-আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক উমামা ফাতেমা ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়।
চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণকারী উমামা ফাতেমা ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি কবি সুফিয়া কামাল হলের আবাসিক ছাত্রী এবং জৈব রসায়ন ও আণবিক জীববিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত।
জুলাই বিপ্লব চলাকালে উমামা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে নারীদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
উমামা বিশ্বাস করেন, এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন সামনের সারিতে থাকা বিদ্রোহী নারীরা, যারা আন্দোলনকে শুধু সফলই করেননি বরং একে রূপ দিয়েছেন গণজাগরণে। সম্প্রতি ঢাকা পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন। বিশেষভাবে তুলে ধরেন, কীভাবে নারী শিক্ষার্থীরা সরকারি দমন-পীড়ন, পুলিশের সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
উমামা ফাতেমা : আন্দোলনের প্রাথমিক সূচনা ঘটে ৫ জুন, ২০২৪। হাইকোর্টের একটি রায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যদিয়ে। সেই রায় প্রত্যাখ্যান করে বিকেলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় আন্দোলনের যাত্রা।
আমি তখন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। সংগঠনের একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে মনে হয়েছিল, এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়া শুধু রাজনৈতিক দায় নয়— এটি ন্যায়ের পক্ষেও অবস্থান নেওয়ার একটি প্রয়োজনীয়তা। আমাদের সংগঠনের অন্য সদস্যদের নিয়ে আমরা আন্দোলনে সম্পূর্ণরূপে অংশগ্রহণ করি।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের পরিধি ও শক্তি বাড়তে থাকে। ৯ জুন রাজু ভাস্কর্যে আয়োজিত কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি তারই প্রমাণ। সেদিনকার মিছিলে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। সেখানেই আমরা কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিই— নারী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে আন্দোলনের কেন্দ্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করব।
এরই ধারাবাহিকতায় ১ জুলাই থেকে যখন আন্দোলন নতুন গতি পায়, তখন আমরা বিভিন্ন হলের নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় শুরু করি। প্রথমদিকে আমি নিজেকে ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে এই আন্দোলনে যুক্ত করলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয় ছাড়িয়ে আমি বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক হয়ে উঠি। বিভিন্ন ফোরামের প্রতিনিধিদের একত্র করে আমি কাজ করেছি একটি যৌথ দাবির পক্ষে— কোটা সংস্কার আন্দোলনের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ ও মজবুত করার জন্য। তখন আর ব্যক্তিপরিচয় নয়, আন্দোলনের স্বার্থই হয়ে উঠেছিল মুখ্য।
উমামা ফাতেমা : এই আন্দোলনের প্রতিটি পর্বেই নারীরা রেখেছেন সাহসিকতার অবিস্মরণীয় ছাপ। শুরু থেকেই তাদের টার্গেট করে দমনচেষ্টা চালানো হয়— যেমনটা ঘটেছিল ১৫ জুলাই। সেদিন ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ পরিকল্পিতভাবে নারীদের ওপর হামলা চালায়, যাতে বিক্ষোভকারীদের মনোবল ভেঙে দেওয়া যায়। তবে, ফল হয়েছিল উল্টো— রক্তাক্ত মুখের সেই নারী শিক্ষার্থীর ছবি সারা দেশে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং বহু মানুষকে আন্দোলনে টেনে আনে।
আমরা দেখেছি, নারী একা দাঁড়িয়ে পুলিশের সামনে প্রতিবাদ করছেন— যখন তাদের সঙ্গীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আমরা দেখেছি, বোনেরা ভাইদের কফিন কাঁধে নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। এই দৃশ্যগুলো কেবল প্রতীকী নয়, তারা আন্দোলনের গভীর মানবিকতা ও প্রতিরোধের শক্তিকে তুলে ধরেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষকরাও নীরব ছিলেন না। তারা শুধু আমাদের সমর্থন করেননি, বরং সরকারের বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের নৈতিক বৈধতা নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন।
এই আন্দোলনে নারীরা শুধু অংশগ্রহণকারীই ছিলেন না, তারা ছিলেন নেতৃত্বের কেন্দ্রে। হল থেকে ছাত্রলীগ নেতাদের তাড়িয়ে দেওয়া হোক বা আটকে পড়া ভাইদের রাস্তায় নামিয়ে আনার ব্যাপারে মেয়েরাই প্রথম এগিয়ে এসেছেন। তারা ভিসি চত্বর ও হলপাড়ায় মিছিল করে, সম্মুখভাগে থেকে প্রতিবাদ সংগঠিত করেছেন।
আমি এখানে নারী-পুরুষ তুলনায় যাচ্ছি না কিংবা নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য বলছি না, আমি শুধু ইতিহাসের সেই সত্যটা তুলে ধরছি যে বিদ্রোহী নারীরাই আন্দোলনের মেরুদণ্ড ছিল। তাদের নেতৃত্ব, সাহসিকতা ও দৃঢ়তা ছাড়া এই আন্দোলন কখনোই একটি সফল বিপ্লবে পরিণত হতো না।
উমামা ফাতেমা : আন্দোলনের প্রাথমিক সূচনা ঘটে ৫ জুন, ২০২৪। হাইকোর্টের একটি রায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যদিয়ে। সেই রায় প্রত্যাখ্যান করে বিকেলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় আন্দোলনের যাত্রা।
আমি তখন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। সংগঠনের একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে মনে হয়েছিল, এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়া শুধু রাজনৈতিক দায় নয়— এটি ন্যায়ের পক্ষেও অবস্থান নেওয়ার একটি প্রয়োজনীয়তা। আমাদের সংগঠনের অন্য সদস্যদের নিয়ে আমরা আন্দোলনে সম্পূর্ণরূপে অংশগ্রহণ করি।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের পরিধি ও শক্তি বাড়তে থাকে। ৯ জুন রাজু ভাস্কর্যে আয়োজিত কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি তারই প্রমাণ। সেদিনকার মিছিলে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। সেখানেই আমরা কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিই— নারী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে আন্দোলনের কেন্দ্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করব।
এরই ধারাবাহিকতায় ১ জুলাই থেকে যখন আন্দোলন নতুন গতি পায়, তখন আমরা বিভিন্ন হলের নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় শুরু করি। প্রথমদিকে আমি নিজেকে ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে এই আন্দোলনে যুক্ত করলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয় ছাড়িয়ে আমি বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক হয়ে উঠি। বিভিন্ন ফোরামের প্রতিনিধিদের একত্র করে আমি কাজ করেছি একটি যৌথ দাবির পক্ষে— কোটা সংস্কার আন্দোলনের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ ও মজবুত করার জন্য। তখন আর ব্যক্তিপরিচয় নয়, আন্দোলনের স্বার্থই হয়ে উঠেছিল মুখ্য।
উমামা ফাতেমা : এই আন্দোলনের প্রতিটি পর্বেই নারীরা রেখেছেন সাহসিকতার অবিস্মরণীয় ছাপ। শুরু থেকেই তাদের টার্গেট করে দমনচেষ্টা চালানো হয়— যেমনটা ঘটেছিল ১৫ জুলাই। সেদিন ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ পরিকল্পিতভাবে নারীদের ওপর হামলা চালায়, যাতে বিক্ষোভকারীদের মনোবল ভেঙে দেওয়া যায়। তবে, ফল হয়েছিল উল্টো— রক্তাক্ত মুখের সেই নারী শিক্ষার্থীর ছবি সারা দেশে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং বহু মানুষকে আন্দোলনে টেনে আনে।
আমরা দেখেছি, নারী একা দাঁড়িয়ে পুলিশের সামনে প্রতিবাদ করছেন— যখন তাদের সঙ্গীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আমরা দেখেছি, বোনেরা ভাইদের কফিন কাঁধে নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। এই দৃশ্যগুলো কেবল প্রতীকী নয়, তারা আন্দোলনের গভীর মানবিকতা ও প্রতিরোধের শক্তিকে তুলে ধরেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষকরাও নীরব ছিলেন না। তারা শুধু আমাদের সমর্থন করেননি, বরং সরকারের বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের নৈতিক বৈধতা নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন।
এই আন্দোলনে নারীরা শুধু অংশগ্রহণকারীই ছিলেন না, তারা ছিলেন নেতৃত্বের কেন্দ্রে। হল থেকে ছাত্রলীগ নেতাদের তাড়িয়ে দেওয়া হোক বা আটকে পড়া ভাইদের রাস্তায় নামিয়ে আনার ব্যাপারে মেয়েরাই প্রথম এগিয়ে এসেছেন। তারা ভিসি চত্বর ও হলপাড়ায় মিছিল করে, সম্মুখভাগে থেকে প্রতিবাদ সংগঠিত করেছেন।
আমি এখানে নারী-পুরুষ তুলনায় যাচ্ছি না কিংবা নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য বলছি না, আমি শুধু ইতিহাসের সেই সত্যটা তুলে ধরছি যে বিদ্রোহী নারীরাই আন্দোলনের মেরুদণ্ড ছিল। তাদের নেতৃত্ব, সাহসিকতা ও দৃঢ়তা ছাড়া এই আন্দোলন কখনোই একটি সফল বিপ্লবে পরিণত হতো না।
চেতনায়২৪ ডেস্ক : 


































