ঢাকা ০৬:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উত্তরায় ৫ আগস্ট বিকেলে শহীদ হয় জাবির বিচার হয়নি আজও ‘বাবা বলে ডাক দিয়ে লুটিয়ে পড়ে নিথর হয়ে যায় ছোট দেহটি’

একটি ছোট্ট ছেলেবেলার গল্প, যার পরিণতি হয় এক নির্মম ট্র্যাজেডিতে। ছয় বছরের শিশু জাবির ইব্রাহিম, যে প্রতিটি মাসের ১৯ তারিখে নিজের জন্মদিন পালন করত, আজ তার পরিবার সেই দিনটিকে স্মরণ করে কান্নাভেজা চোখে।

জাবির শহীদ হয়েছিল গত বছরের ৫ আগস্ট, জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের বিজয় উদযাপন চলাকালে। বাবা-মায়ের কোল থেকে ছিটকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল এই শিশু, যে জীবন শুরু করেছিল মাত্র ২০১৮ সালে।

গত বছরের ৫ আগস্ট বিকেলে, রাজধানী ঢাকার উত্তরায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিজয় উদযাপন চলছিল। শিশু জাবির তার পরিবারসহ অংশ নিয়েছিল এই উৎসবে। কিন্তু হঠাৎ পুলিশের গুলিতে বদলে যায় সবকিছু। জাবির সেই গুলিতে আহত হয়ে মারা যায়। তার অপরাধ—সে চেয়েছিল বিজয়ে অংশ নিতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। মাত্র ছয় বছর বয়সী এই শিশুর শহীদ হওয়া গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দেয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের তুলাই শিমুল গ্রামে জাবিরদের আদি বাড়ি হলেও, পরিবারটি বসবাস করত ঢাকার উত্তরায়। সে উত্তরার কেসি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নার্সারি বিভাগের ছাত্র ছিল। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে জাবির ছিল সবার ছোট এবং পরিবারের আদরের।

জাবিরের বাবা কবির হোসেন জানালেন, জাবিরের কাছে ১৯ তারিখ মানেই জন্মদিন। দেয়ালে ‘১৯’ লেখার সময় ‘৯’-এর স্টিকার লাগিয়ে দিয়েছিল সে, কিন্তু ‘১’ খুঁজতে গিয়েই তার জীবন থেমে যায়। এখন সেই ‘১৯’ দিনটিই হয়ে উঠেছে পরিবারের অশ্রুজলভেজা স্মৃতির দিন।

৫ আগস্ট সকালে জাবির হেলমেট পরে বলেছিল, “আমি আর্মি হবো। পুলিশ আমার ভাইদের মারে, তাই ওদের মারবো।” শিশুসুলভ কথায় প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল সে। বিকেলে বিজয় মিছিলে অংশ নিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাতে জয় উদযাপন করছিল। কিন্তু একটি গুলি তার ডান পায়ে লাগে। বাবার কোলে থাকা অবস্থাতেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আহত জাবিরকে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানকার চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। পরে ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে জাবির দুবার “বাবা” বলে ডেকেছিল। সেই মুহূর্ত আজও ঘোর লাগা কষ্ট হয়ে রয়ে গেছে জাবিরের বাবা-মায়ের হৃদয়ে।

জাবির শহীদ হওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু প্রতিশ্রুতি এলেও এখন পর্যন্ত তার হত্যার বিচার হয়নি। পরিবার বলছে, স্মৃতি রক্ষায় একটি সড়কের নামকরণ, স্থাপনার নামকরণ বা অন্যান্য উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। প্রশাসন বা কোনো সংগঠনের পক্ষ থেকেও আর কেউ খোঁজ নেয় না বলে জানিয়েছেন জাবিরের বাবা।

তবে সম্প্রতি আখাউড়া উপজেলা পরিষদ মাঠে জাবিরের স্মরণে একটি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। ঢাকায় তার কবর পাকাকরণ ও কিছু স্মৃতি সংরক্ষণের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। পরিবার সেই আশায় এখনও বুক বেঁধে আছে।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

স্ত্রী দেখতে ‘সুন্দর’ না হওয়ায় তাকে তালাক দেওয়া যাবে?

উত্তরায় ৫ আগস্ট বিকেলে শহীদ হয় জাবির বিচার হয়নি আজও ‘বাবা বলে ডাক দিয়ে লুটিয়ে পড়ে নিথর হয়ে যায় ছোট দেহটি’

আপডেট সময় : ০৩:১৬:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ অগাস্ট ২০২৫

একটি ছোট্ট ছেলেবেলার গল্প, যার পরিণতি হয় এক নির্মম ট্র্যাজেডিতে। ছয় বছরের শিশু জাবির ইব্রাহিম, যে প্রতিটি মাসের ১৯ তারিখে নিজের জন্মদিন পালন করত, আজ তার পরিবার সেই দিনটিকে স্মরণ করে কান্নাভেজা চোখে।

জাবির শহীদ হয়েছিল গত বছরের ৫ আগস্ট, জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের বিজয় উদযাপন চলাকালে। বাবা-মায়ের কোল থেকে ছিটকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল এই শিশু, যে জীবন শুরু করেছিল মাত্র ২০১৮ সালে।

গত বছরের ৫ আগস্ট বিকেলে, রাজধানী ঢাকার উত্তরায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিজয় উদযাপন চলছিল। শিশু জাবির তার পরিবারসহ অংশ নিয়েছিল এই উৎসবে। কিন্তু হঠাৎ পুলিশের গুলিতে বদলে যায় সবকিছু। জাবির সেই গুলিতে আহত হয়ে মারা যায়। তার অপরাধ—সে চেয়েছিল বিজয়ে অংশ নিতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। মাত্র ছয় বছর বয়সী এই শিশুর শহীদ হওয়া গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দেয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের তুলাই শিমুল গ্রামে জাবিরদের আদি বাড়ি হলেও, পরিবারটি বসবাস করত ঢাকার উত্তরায়। সে উত্তরার কেসি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নার্সারি বিভাগের ছাত্র ছিল। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে জাবির ছিল সবার ছোট এবং পরিবারের আদরের।

জাবিরের বাবা কবির হোসেন জানালেন, জাবিরের কাছে ১৯ তারিখ মানেই জন্মদিন। দেয়ালে ‘১৯’ লেখার সময় ‘৯’-এর স্টিকার লাগিয়ে দিয়েছিল সে, কিন্তু ‘১’ খুঁজতে গিয়েই তার জীবন থেমে যায়। এখন সেই ‘১৯’ দিনটিই হয়ে উঠেছে পরিবারের অশ্রুজলভেজা স্মৃতির দিন।

৫ আগস্ট সকালে জাবির হেলমেট পরে বলেছিল, “আমি আর্মি হবো। পুলিশ আমার ভাইদের মারে, তাই ওদের মারবো।” শিশুসুলভ কথায় প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল সে। বিকেলে বিজয় মিছিলে অংশ নিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাতে জয় উদযাপন করছিল। কিন্তু একটি গুলি তার ডান পায়ে লাগে। বাবার কোলে থাকা অবস্থাতেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আহত জাবিরকে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানকার চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। পরে ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে জাবির দুবার “বাবা” বলে ডেকেছিল। সেই মুহূর্ত আজও ঘোর লাগা কষ্ট হয়ে রয়ে গেছে জাবিরের বাবা-মায়ের হৃদয়ে।

জাবির শহীদ হওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু প্রতিশ্রুতি এলেও এখন পর্যন্ত তার হত্যার বিচার হয়নি। পরিবার বলছে, স্মৃতি রক্ষায় একটি সড়কের নামকরণ, স্থাপনার নামকরণ বা অন্যান্য উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। প্রশাসন বা কোনো সংগঠনের পক্ষ থেকেও আর কেউ খোঁজ নেয় না বলে জানিয়েছেন জাবিরের বাবা।

তবে সম্প্রতি আখাউড়া উপজেলা পরিষদ মাঠে জাবিরের স্মরণে একটি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। ঢাকায় তার কবর পাকাকরণ ও কিছু স্মৃতি সংরক্ষণের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। পরিবার সেই আশায় এখনও বুক বেঁধে আছে।