দীর্ঘ ৪২ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে বৃহৎ পরিসরে নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছাত্রশিবির। শনিবার (১৫ নভেম্বর) কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এই অনুষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে ‘ভাই পলিটিকস’-এর অবসানের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন , অতীতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে বহু শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার নষ্ট হয়েছে, কিন্তু এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞান, গবেষণা ও সুশিক্ষার কেন্দ্র।
অনুষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের ওপর পূর্ববর্তী সরকারের বর্বরোচিত নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হয় এবং ডাকসু ভিপি সাদেক কায়েম মন্তব্য করেন, ‘খুনি হাসিনা’ দিল্লিতে পালিয়ে গেলেও ছাত্রশিবির মানুষের হৃদয়ে থেকে গেছে এবং ন্যায়ের পক্ষে লড়ে যাবে।
শিবির সভাপতি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান ও গবেষণার চর্চা হবে। মানুষ তৈরি হবে। অতীতে শিক্ষাঙ্গনে যা হয়েছে তা শিক্ষাবান্ধব ছিল না। শিক্ষকদের নোংরা রাজনীতি, সংঘাত আর বিভাজনের কারণে আমাদের বহু ভাই শহীদ হয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, একটি শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে ‘জুলাই’কে কেন্দ্র করে বিভাজন সৃষ্টি করছে। আগে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করত, এখন জুলাই নিয়ে ব্যবসা করছে। জুলাই কারো ব্যক্তিগত নয়; এটি সবার।
অনুষ্ঠানে ডাকসু ভিপি সাদেক কায়েম বলেন, ‘খুনি হাসিনা ছাত্রশিবিরের ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন চালিয়েছে এবং সর্বশেষ ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধও করেছিল। কিন্তু ছাত্রশিবির মানুষের হৃদয়ে থেকে গেছে এবং হাসিনা দিল্লিতে পালিয়েছে। ছাত্রশিবির দেশের মানুষের ন্যায়ের পক্ষে লড়ে যাবে।’
রাবি শিক্ষার্থীদের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে রাবি শিক্ষার্থীদের ত্যাগের গল্প শুনে বড় হয়েছি। বিগত ফ্যাসিবাদী সময়ে এই ক্যাম্পাসে গণরুম এবং গেস্ট রুমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনে করা হতো। শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হতো। কেউ ইসলাম চর্চা করলে তাকে ট্যাগিং করা হতো।’
অনুষ্ঠানে রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ ১৯৮২ সালের নবীনবরণে নিহত চার কর্মীর স্মৃতি স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘১১ মার্চ ১৯৮২ সালের নবীনবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আমাদের চার ভাই বাড়ি ফিরতে পারেননি। তারা ছিলেন সাব্বির ভাই, হামিদ ভাই, আইয়ুব ভাই ও জব্বার ভাই। তাদের কারণেই প্রতিবছর ১১ মার্চ ছাত্রশিবির শহীদ দিবস পালন করে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যে ক্যাম্পাসে আমাদের ভাইদের রক্ত ঝরেছে, আজ সেই ক্যাম্পাসেই আবার নবীনবরণ আয়োজন করতে পারছি এটি আমাদের জন্য আবেগের মুহূর্ত।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মাঈন উদ্দীন বলেন, ‘অতীতে হলে উঠতে শিক্ষার্থীদের ৮-১০ হাজার টাকা দিতে হতো। সিট বাণিজ্যের মতো অনিয়ম বন্ধে প্রশাসন কড়াভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে। এই ক্যাম্পাসে অতীতে পদ্মা সেতুর জন্য টাকা উঠানো হয়েছিল, আর সেই টাকা ভাগাভাগি নিয়ে মানুষ খুন হয়েছে। আগস্ট বিপ্লবের পর এ ধরনের সংস্কৃতি বদলে গেছে।’
তিনি মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার জন্য নবীনদের সতর্ক করে বলেন, ‘এই ক্যাম্পাস একসময় মাদকের আখড়া ছিল। গত সপ্তাহেও ১০ জনকে গাঁজাসহ আটক করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে দেব না।’
অনুষ্ঠানে নবীন শিক্ষার্থীদের উপহারসামগ্রী প্রদান, ক্যারিয়ার গাইডলাইন এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নমূলক পরামর্শ দেওয়া হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ডাকসু ও চাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও ইব্রাহিম হোসেন রনি, শিবিরের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও সমাজসেবা সম্পাদকসহ বিভিন্ন বিভাগের ডীন, হল প্রভোস্ট এবং প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থী।