ঢাকা ০৯:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টাইফয়েড টিকা: ১২৯ বছর আগে ব্রিটিশ সেনা দিয়ে শুরু, আজ বিশ্বজুড়ে আশীর্বাদ

  • চেতনায়২৪ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৫:৩৭:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫
  • ২৪৪ বার পড়া হয়েছে
ব্রিটিশ সেনা দিয়ে শুরু হয়েছিল টাইফয়েড টিকার যাত্রা।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল এক ভয়ংকর ব্যাধি—টাইফয়েড জ্বর। বিশুদ্ধ পানির অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং জনসচেতনতার অভাবে মুহূর্তেই এই রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া টাইফয়েডের প্রতিষেধক উদ্ভাবন ছিল চিকিৎসা বিজ্ঞানের সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জগুলোকেই শক্ত হাতে মোকাবিলা করেছিলেন কিছু বিজ্ঞানী। তাদের প্রাণান্ত চেষ্টার ফলে ১২৯ বছর আগে জন্ম নেয় টাইফয়েড টিকা, যা আজ হয়ে উঠেছে সারাবিশ্বের জন্য আশীর্বাদ।

টাইফয়েডের ভয়াবহতা ও প্রাথমিক গবেষণা

টাইফয়েড জ্বর ‘সালমোনেলা টাইফি’ নামে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ছড়ায়। এটি সাধারণত দূষিত পানি বা খাদ্যের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে। উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, পেটব্যথা, এমনকি অন্ত্র ফেটে যাওয়া—এসব ছিল এই রোগের সাধারণ উপসর্গ। চিকিৎসা ব্যবস্থা তখনো দুর্বল, ফলে ইউরোপে এটি প্রায় মহামারির রূপ নেয়।

১৮৮০ সালে জার্মান চিকিৎসক কার্ল জোসেফ এবের্থ প্রথমবারের মতো টাইফয়েডের জীবাণু শনাক্ত করেন। এরপর ১৮৮৪ সালে তারই সহকর্মী জর্জ গ্যাফকি সফলভাবে ব্যাকটেরিয়াটি পৃথক করে পরীক্ষাগারে চাষ করতে সক্ষম হন। এই আবিষ্কারটাই পরবর্তী প্রতিষেধক উদ্ভাবনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

প্রথম টিকার জন্ম

১৮৯৬ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক আলমরথ এডওয়ার্ড রাইট প্রথম কার্যকর টাইফয়েড টিকা তৈরি করেন। তিনি মৃত টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে একটি ‘কিলড ভ্যাকসিন’ তৈরি করেন, যা শরীরে ইনজেকশন দেওয়ার পর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।

এই টিকা প্রথম ব্যবহৃত হয় ব্রিটিশ সেনাদের মধ্যে, বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার বোর যুদ্ধ চলাকালে। টিকা নেওয়া সৈন্যদের মধ্যে টাইফয়েডে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। রাইটের এই সাফল্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে টিকা প্রযুক্তির এক নতুন যুগের সূচনা করে।

আধুনিক টিকার অগ্রযাত্রা: ইউরোপ থেকে ভারত

রাইটের প্রাথমিক আবিষ্কারের পর টাইফয়েড টিকা আরও কার্যকর, নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা চলতে থাকে।

টিওয়াই২১এ — মুখে খাওয়ার টিকা

১৯৭০-এর দশকে সুইস ন্যাশনাল ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের গবেষকরা তৈরি করেন ‘টিওয়াই২১এ’, যা ছিল এক প্রকার দুর্বল ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক টিকা। এটি মুখে খাওয়ার জন্য তৈরি করা হয় এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক কম ছিল। পরে টিকাটি বাজারজাত করে বারনা বায়োটেক, যা পরে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পায়।

ভি পলিস্যাকারাইড — ইনজেকশন টিকা 

১৯৮০–১৯৯০-এর দশকে জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের গবেষক দল ‘ভি ক্যাপসুলার অ্যান্টিজেন’–এর ভিত্তিতে আরেকটি আধুনিক টিকা তৈরি করে। এটি শরীরে ইনজেকশন দিয়ে দেওয়া হয় এবং সাধারণত দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়। ১৯৯৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই টিকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়।

টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) — নতুন প্রজন্মের টিকা 

টাইফয়েড টিকা প্রযুক্তির সর্বশেষ ধাপ হলো ‘টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন’ (টিসিভি)। আন্তর্জাতিক গবেষণা অংশীদারদের সহযোগিতায় টাইপবার-টিসিভি তৈরি করে ভারতের ‘ভারত বায়োটেক’। ২০১৮ সালে ডব্লিউএইচও এই টিকাকে প্রাক-যোগ্যতা দেয়, ফলে এটি বিশ্বব্যাপী ব্যবহারের অনুমতি পায়।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হাসিনাকে ফেরত না দিয়ে ভারত চক্রান্ত করছে: রিজভী

টাইফয়েড টিকা: ১২৯ বছর আগে ব্রিটিশ সেনা দিয়ে শুরু, আজ বিশ্বজুড়ে আশীর্বাদ

আপডেট সময় : ০৫:৩৭:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫
ব্রিটিশ সেনা দিয়ে শুরু হয়েছিল টাইফয়েড টিকার যাত্রা।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল এক ভয়ংকর ব্যাধি—টাইফয়েড জ্বর। বিশুদ্ধ পানির অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং জনসচেতনতার অভাবে মুহূর্তেই এই রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া টাইফয়েডের প্রতিষেধক উদ্ভাবন ছিল চিকিৎসা বিজ্ঞানের সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জগুলোকেই শক্ত হাতে মোকাবিলা করেছিলেন কিছু বিজ্ঞানী। তাদের প্রাণান্ত চেষ্টার ফলে ১২৯ বছর আগে জন্ম নেয় টাইফয়েড টিকা, যা আজ হয়ে উঠেছে সারাবিশ্বের জন্য আশীর্বাদ।

টাইফয়েডের ভয়াবহতা ও প্রাথমিক গবেষণা

টাইফয়েড জ্বর ‘সালমোনেলা টাইফি’ নামে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ছড়ায়। এটি সাধারণত দূষিত পানি বা খাদ্যের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে। উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, পেটব্যথা, এমনকি অন্ত্র ফেটে যাওয়া—এসব ছিল এই রোগের সাধারণ উপসর্গ। চিকিৎসা ব্যবস্থা তখনো দুর্বল, ফলে ইউরোপে এটি প্রায় মহামারির রূপ নেয়।

১৮৮০ সালে জার্মান চিকিৎসক কার্ল জোসেফ এবের্থ প্রথমবারের মতো টাইফয়েডের জীবাণু শনাক্ত করেন। এরপর ১৮৮৪ সালে তারই সহকর্মী জর্জ গ্যাফকি সফলভাবে ব্যাকটেরিয়াটি পৃথক করে পরীক্ষাগারে চাষ করতে সক্ষম হন। এই আবিষ্কারটাই পরবর্তী প্রতিষেধক উদ্ভাবনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

প্রথম টিকার জন্ম

১৮৯৬ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক আলমরথ এডওয়ার্ড রাইট প্রথম কার্যকর টাইফয়েড টিকা তৈরি করেন। তিনি মৃত টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে একটি ‘কিলড ভ্যাকসিন’ তৈরি করেন, যা শরীরে ইনজেকশন দেওয়ার পর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।

এই টিকা প্রথম ব্যবহৃত হয় ব্রিটিশ সেনাদের মধ্যে, বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার বোর যুদ্ধ চলাকালে। টিকা নেওয়া সৈন্যদের মধ্যে টাইফয়েডে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। রাইটের এই সাফল্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে টিকা প্রযুক্তির এক নতুন যুগের সূচনা করে।

আধুনিক টিকার অগ্রযাত্রা: ইউরোপ থেকে ভারত

রাইটের প্রাথমিক আবিষ্কারের পর টাইফয়েড টিকা আরও কার্যকর, নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা চলতে থাকে।

টিওয়াই২১এ — মুখে খাওয়ার টিকা

১৯৭০-এর দশকে সুইস ন্যাশনাল ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের গবেষকরা তৈরি করেন ‘টিওয়াই২১এ’, যা ছিল এক প্রকার দুর্বল ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক টিকা। এটি মুখে খাওয়ার জন্য তৈরি করা হয় এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক কম ছিল। পরে টিকাটি বাজারজাত করে বারনা বায়োটেক, যা পরে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পায়।

ভি পলিস্যাকারাইড — ইনজেকশন টিকা 

১৯৮০–১৯৯০-এর দশকে জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের গবেষক দল ‘ভি ক্যাপসুলার অ্যান্টিজেন’–এর ভিত্তিতে আরেকটি আধুনিক টিকা তৈরি করে। এটি শরীরে ইনজেকশন দিয়ে দেওয়া হয় এবং সাধারণত দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়। ১৯৯৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই টিকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়।

টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) — নতুন প্রজন্মের টিকা 

টাইফয়েড টিকা প্রযুক্তির সর্বশেষ ধাপ হলো ‘টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন’ (টিসিভি)। আন্তর্জাতিক গবেষণা অংশীদারদের সহযোগিতায় টাইপবার-টিসিভি তৈরি করে ভারতের ‘ভারত বায়োটেক’। ২০১৮ সালে ডব্লিউএইচও এই টিকাকে প্রাক-যোগ্যতা দেয়, ফলে এটি বিশ্বব্যাপী ব্যবহারের অনুমতি পায়।