ঢাকা ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
৫০ বছর পর পাকিস্তান থেকে স্বজনদের কাছে ফিরলেন পরী সন্ত্রাসী কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় আ.লীগের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ নেই: তথ্য উপদেষ্টা অবিলম্বে আওয়ামী লীগের বিচার শুরু করতে হবে: নাহিদ ইসলাম হুথি কারা? কেন তারা সৌদি আরবে হামলা চালাচ্ছে? নিজের বাড়ির জানালা সংস্কারে এভাবে অবহেলা করতেন? হামলার ভয়ে এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সৌদি যুবরাজ ড. ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে: তথ্য উপদেষ্টা জন্মদিনে গাড়ি উপহার দেন মা, সেই গাড়ি দিয়ে সড়কে ৩ জনের প্রাণ নিলেন ছেলে ইন্ডিয়া জোটের পদযাত্রায় দিল্লির রাজপথে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী বাংকারযুক্ত প্রাসাদে অবস্থান বদল সৌদি যুবরাজের!

সরকারের ভুল নীতিতে বৈধ অর্থ অপ্রদর্শিত রাখতে হচ্ছে

  • Tareq Jamil
  • আপডেট সময় : ০২:৫৬:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
  • ২৪২ বার পড়া হয়েছে

আলী আফজাল

দেশের আবাসন শিল্পের ওপর প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক হরেক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এ ব্যবসায়। সরকারের নানা নীতি-কাঠামোকেও প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। খাত-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়েছে বিশৃঙ্খলাও; রয়েছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, ব্যবসায় অনৈতিকতা ও ক্রেতা হয়রানির অসংখ্য ঘটনা। সব মিলিয়ে ইমেজ সংকটও আবাসন ব্যবসার গতিকে শ্লথ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে আমার দেশ-এর সঙ্গে কথা বলেছেন আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সভাপতি কৃষিবিদ ড. আলী আফজাল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান

 আবাসন শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি কী?

আলী আফজাল : এক কথায় আবাসন ব্যবসায়ীরা ভালো নেই। বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে আবাসন খাতে। ল্যান্ড কিংবা অ্যাপার্টমেন্ট উভয় মিলে ৯৫ শতাংশ ব্যবসায়ীর ব্যবসার অবস্থা খারাপ। এই খাত-সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। একইভাবে বেড়েছে ফ্ল্যাটের দাম, যা অনেক ক্রেতার সাধ্যের বাইরে। অধিকাংশ উদ্যোক্তা নতুন কোনো প্রকল্প হাতে নিচ্ছেন না। পুরোনো প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অবধারিত লোকসানের ভয়েও অনেক কোম্পানি কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

কেন এমন হলো এবং সেটা কখন থেকে?

আলী আফজাল : হঠাৎ করে এই বিপর্যয় নেমে আসেনি। এর সূচনা হয়েছে ২০০৯ সালে। তাতে নতুন মাত্রা যোগ করে ২০১০ সালে যখন তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা রিহ্যাব দখল করে; করোনা মহামারিতে তা বেগবান হয়েছে। রিহ্যাবকে ব্যবহার করে নসরুল হামিদ বিপু-শামসুল আলামিন চক্রের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা এবং ক্রেতা হয়রানিতে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের প্রতি চরম আস্থাহীনতাও এই পরিণতির জন্য দায়ী।

আমলাতন্ত্রের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, অসাধু ব্যবসায়ী ও লুটেরা রাজনীতিবিদদের সিন্ডিকেট ব্যবসা তথা দেশ ধ্বংসের মূল হোতা। ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসকরা রিহ্যাবের অনির্বাচিত পকেট কমিটি দিয়ে আবাসন শিল্প খাতকে ধ্বংস করেছে। নেতৃত্বের আড়ালে রিহ্যাব সদস্যদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। দেশে-বিদেশে মেলা আয়োজনের নামে লাখো কোটি টাকা তুলে মেলা না করে তা লুটপাট করেছে। কিন্তু রিহ্যাব বা প্রকৃত আবাসন ব্যবসায়ীদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

 ড্যাপের কারণে কী সমস্যা হচ্ছে? রিহ্যাব কী চায়?

আলী আফজাল : ড্যাপের মাধ্যমে প্রথমেই বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এর মধ্যে বাস্তবতা-বিবর্জিত তুঘলকি শর্ত ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদি উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মিরপুর ডিএইচওএসের চার কাঠা জমিতে আটতলা-নয়তলা ভবন করা যায়। কিন্তু তাদের দেয়ালের ঠিক বাইরে একজন নাগরিক তার সমপরিমাণ জমিতে চারতলা বেশি করার অনুমতি পাবেন না—এটি ড্যাপের মধ্যে বলা আছে।

সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য, এই ড্যাপে দেশের আগামী দিনের জনসংখ্যাকে আমলে নেওয়া হয়নি। মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশ কিন্তু আমেরিকা-কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া নয়। অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের ৭১ গুণ বড়। পপুলেশন মাত্র দুই কোটি। আর আমার দেশের ছোট্ট একটা ভূখণ্ডে ১৮ কোটি মানুষ বাস করে। পপুলেশন গ্রোথ পজিটিভ। এটা কিন্তু ২০৫০ সালে ২৫ কোটি হবে। ২১০০ সালে এই পপুলেশন ৩৫ কোটি হবে।

ড্যাপ অনুযায়ী বাড়ি চারতলা ও পাঁচতলার বেশি করা যাবে না। তাহলে ৩৫ কোটি মানুষের আবাসনে বাংলাদেশের ১০০টা চাষযোগ্য জমিও থাকবে না।

 ড্যাপ নিয়ে প্রকৌশলী ও প্ল্যানারদের মধ্যে বিরোধ কেন? নিষ্পত্তি কেন নয়?

আলী আফজাল : আমি বিরোধের কিছু দেখি না। লক্ষ্য যদি অভিন্ন হয়, আর তা যদি আবাসন সমস্যার সমাধানের উদ্দেশ্যে হয়, তাতে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। উভয় পক্ষের মধ্যে দূরত্ব কমাতে এরই মধ্যে প্ল্যানারদের সঙ্গে মিটিং করেছি। প্ল্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের বোর্ড এবং রিহ্যাব বোর্ড যৌথ সভা করেছি।

কৃষিবিদ আলী আফজাল চলতি বছরের এপ্রিলে রিহ্যাবের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ছবি: সংগৃহীত
কৃষিবিদ আলী আফজাল চলতি বছরের এপ্রিলে রিহ্যাবের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকাসহ সারা দেশে অপরিকল্পিত ভবন হচ্ছে, কোনো শৃঙ্খলা নেই কেন?

আলী আফজাল : এখানে সবার আগে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা দরকার। সরকারি-বেসরকারি পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় না থাকায় যে যার মতো করে কথা বলে। পরিবেশবাদীরা আর প্ল্যানাররা বলছেন, ইউটিলিটি সুবিধা নিশ্চিত না করে বহুতল ভবন করা যাবে না। আমার মতে, আমরা নাগরিকরা, ব্যবসায়ীরা ও শিল্পোদ্যোক্তারা সরকার-নির্ধারিত হারে কর দিচ্ছি। ইউটিলিটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। এর পরও কেউ পাবে, কেউ পাবে না—এই বৈষম্যের কারণেও নগরায়ণে কোনো শৃঙ্খলা আসছে না। রাজধানীর মতিঝিলে ৩৭ তলা সিটি সেন্টার ভবন রয়েছে। কিন্তু এরপর একই উচ্চতার ভবনের অনুমোদন চাইলে ভবন দেবে যাবে, পরিবেশ নষ্ট হবে, মাটি এত ওজন নিতে পারবে না—এ ধরনের অজুহাতে আর ওই উচ্চতার ভবনের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না, যা অবান্তর।

 কর কাঠামোতে সমস্যা কী? তা উত্তরণে আপনারা কী চাইছেন?

আলী আফজাল : বাজেট প্রণয়নের শেষ ভাগে আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর কর কাঠামো সংশোধন নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ে অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু কমানোর পরিবর্তে নতুন করে বোঝা চেপেছে। বাজেটে আমাদের সাপোর্ট শিল্পের বিভিন্ন পণ্যের ওপর যে করারোপ করা হয়েছে, তা মোট ৪৪ শতাংশের মতো। তার ওপর আমাদের ফ্ল্যাট বা জমির রেজিস্ট্রেশন খরচ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।

আবাসন খাতে ব্যাংকঋণের চাহিদা ও জোগান কেমন?

আলী আফজাল : আওয়ামী সরকারের লুটপাটের সহযোগী ব্যবসায়ীরা ঋণের নামে ব্যাংক থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা তছরুপ করেছে। ফলে ব্যাংকে তো টাকা নেই। আবাসন খাতে লম্বা সময় ব্যাংকের কোনো বিনিয়োগ নেই। তাছাড়া আবাসনে ঋণের যে উচ্চ সুদ হার, তা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতায় অনেক ক্রেতার পক্ষে টাকা ফেরত দেওয়া কঠিন।

 ব্যবসার ক্ষেত্রে রিহ্যাব সদস্যরা কোন ধরনের সমস্যার মুখে পড়ছেন?

আলী আফজাল : আমরা সরকারকে বলেছি, একটা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস করে দিন এবং বর্তমান ফি যদি এক লাখ থাকলে দ্বিগুণ করেন—আপত্তি নেই। কিন্তু এক লাখ দেওয়ার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে ১০ লাখ টাকা খরচ করতে চাই না। একদিকে ঘুস দিতে হয়, অন্যদিকে প্ল্যান হাতে পেতে এক থেকে দুই বছর লেগে যায়। আমাদের কথা পরিষ্কার, ডকুমেন্টস লাগবে উল্লেখ থাকলে সবসহ জমা দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে প্ল্যান দিতে হবে। রেজিস্ট্রার অফিসে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় কোনো মানুষের সম্পৃক্ততা থাকবে না।

এ খাতে আরেকটি শুভঙ্করের ফাঁকি দেশের আমলারা করে রাখছেন। ধরুন, মিরপুরে একটা বড় ফ্ল্যাটের দাম আড়াই কোটি টাকা। আইনানুযায়ি, মৌজা ও বর্গফুটের দর ধরা আছে, আবার শতাংশেরও আছে। রাষ্ট্র বলছে, এটা হচ্ছে মিনিমাম রেট। মিনিমাম রেট মানে কী? ওটায় পাঁচ টাকা বেশি দিলেই আপনি রেজিস্ট্রি করতে পারেন। ফলে আড়াই কোটি টাকা হালাল হয়ে গেল মাত্র ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে! কিন্তু ওই ফ্ল্যাট বানানোর খরচ যদি ২ কোটি ২০ লাখ টাকাও হয় এবং আমার মুনাফা ৩০ লাখ টাকা। তাহলে রাষ্ট্রীয় আইনের কারণে আমি দুই কোটি টাকা দেখাতে পারছি না। ফলে আমার হালাল টাকাও অপ্রদর্শিত থেকে যাচ্ছে।

সরকারের ভুল সিস্টেমের কারণে বৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ অপ্রদর্শিত রাখতে হচ্ছে। এই ফ্ল্যাট বেচাকেনায় প্রতি বছর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা এভাবে অপ্রদর্শিত হয়। তাহলে এ অর্থ যাবে কোথায়? এটা শো করলে এনবিআর যে ঝামেলা শুরু করে তা বর্ণনাতীত। এজন্য ব্যবসায়ীরা টাকাটা পাচার করে। সেজন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছি সিস্টেম বদলাতে।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৫০ বছর পর পাকিস্তান থেকে স্বজনদের কাছে ফিরলেন পরী

সরকারের ভুল নীতিতে বৈধ অর্থ অপ্রদর্শিত রাখতে হচ্ছে

আপডেট সময় : ০২:৫৬:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

দেশের আবাসন শিল্পের ওপর প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক হরেক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এ ব্যবসায়। সরকারের নানা নীতি-কাঠামোকেও প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। খাত-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়েছে বিশৃঙ্খলাও; রয়েছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, ব্যবসায় অনৈতিকতা ও ক্রেতা হয়রানির অসংখ্য ঘটনা। সব মিলিয়ে ইমেজ সংকটও আবাসন ব্যবসার গতিকে শ্লথ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে আমার দেশ-এর সঙ্গে কথা বলেছেন আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সভাপতি কৃষিবিদ ড. আলী আফজাল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান

 আবাসন শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি কী?

আলী আফজাল : এক কথায় আবাসন ব্যবসায়ীরা ভালো নেই। বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে আবাসন খাতে। ল্যান্ড কিংবা অ্যাপার্টমেন্ট উভয় মিলে ৯৫ শতাংশ ব্যবসায়ীর ব্যবসার অবস্থা খারাপ। এই খাত-সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। একইভাবে বেড়েছে ফ্ল্যাটের দাম, যা অনেক ক্রেতার সাধ্যের বাইরে। অধিকাংশ উদ্যোক্তা নতুন কোনো প্রকল্প হাতে নিচ্ছেন না। পুরোনো প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অবধারিত লোকসানের ভয়েও অনেক কোম্পানি কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

কেন এমন হলো এবং সেটা কখন থেকে?

আলী আফজাল : হঠাৎ করে এই বিপর্যয় নেমে আসেনি। এর সূচনা হয়েছে ২০০৯ সালে। তাতে নতুন মাত্রা যোগ করে ২০১০ সালে যখন তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা রিহ্যাব দখল করে; করোনা মহামারিতে তা বেগবান হয়েছে। রিহ্যাবকে ব্যবহার করে নসরুল হামিদ বিপু-শামসুল আলামিন চক্রের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা এবং ক্রেতা হয়রানিতে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের প্রতি চরম আস্থাহীনতাও এই পরিণতির জন্য দায়ী।

আমলাতন্ত্রের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, অসাধু ব্যবসায়ী ও লুটেরা রাজনীতিবিদদের সিন্ডিকেট ব্যবসা তথা দেশ ধ্বংসের মূল হোতা। ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসকরা রিহ্যাবের অনির্বাচিত পকেট কমিটি দিয়ে আবাসন শিল্প খাতকে ধ্বংস করেছে। নেতৃত্বের আড়ালে রিহ্যাব সদস্যদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। দেশে-বিদেশে মেলা আয়োজনের নামে লাখো কোটি টাকা তুলে মেলা না করে তা লুটপাট করেছে। কিন্তু রিহ্যাব বা প্রকৃত আবাসন ব্যবসায়ীদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

 ড্যাপের কারণে কী সমস্যা হচ্ছে? রিহ্যাব কী চায়?

আলী আফজাল : ড্যাপের মাধ্যমে প্রথমেই বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এর মধ্যে বাস্তবতা-বিবর্জিত তুঘলকি শর্ত ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদি উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মিরপুর ডিএইচওএসের চার কাঠা জমিতে আটতলা-নয়তলা ভবন করা যায়। কিন্তু তাদের দেয়ালের ঠিক বাইরে একজন নাগরিক তার সমপরিমাণ জমিতে চারতলা বেশি করার অনুমতি পাবেন না—এটি ড্যাপের মধ্যে বলা আছে।

সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য, এই ড্যাপে দেশের আগামী দিনের জনসংখ্যাকে আমলে নেওয়া হয়নি। মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশ কিন্তু আমেরিকা-কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া নয়। অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের ৭১ গুণ বড়। পপুলেশন মাত্র দুই কোটি। আর আমার দেশের ছোট্ট একটা ভূখণ্ডে ১৮ কোটি মানুষ বাস করে। পপুলেশন গ্রোথ পজিটিভ। এটা কিন্তু ২০৫০ সালে ২৫ কোটি হবে। ২১০০ সালে এই পপুলেশন ৩৫ কোটি হবে।

ড্যাপ অনুযায়ী বাড়ি চারতলা ও পাঁচতলার বেশি করা যাবে না। তাহলে ৩৫ কোটি মানুষের আবাসনে বাংলাদেশের ১০০টা চাষযোগ্য জমিও থাকবে না।

 ড্যাপ নিয়ে প্রকৌশলী ও প্ল্যানারদের মধ্যে বিরোধ কেন? নিষ্পত্তি কেন নয়?

আলী আফজাল : আমি বিরোধের কিছু দেখি না। লক্ষ্য যদি অভিন্ন হয়, আর তা যদি আবাসন সমস্যার সমাধানের উদ্দেশ্যে হয়, তাতে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। উভয় পক্ষের মধ্যে দূরত্ব কমাতে এরই মধ্যে প্ল্যানারদের সঙ্গে মিটিং করেছি। প্ল্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের বোর্ড এবং রিহ্যাব বোর্ড যৌথ সভা করেছি।

কৃষিবিদ আলী আফজাল চলতি বছরের এপ্রিলে রিহ্যাবের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ছবি: সংগৃহীত
কৃষিবিদ আলী আফজাল চলতি বছরের এপ্রিলে রিহ্যাবের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকাসহ সারা দেশে অপরিকল্পিত ভবন হচ্ছে, কোনো শৃঙ্খলা নেই কেন?

আলী আফজাল : এখানে সবার আগে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা দরকার। সরকারি-বেসরকারি পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় না থাকায় যে যার মতো করে কথা বলে। পরিবেশবাদীরা আর প্ল্যানাররা বলছেন, ইউটিলিটি সুবিধা নিশ্চিত না করে বহুতল ভবন করা যাবে না। আমার মতে, আমরা নাগরিকরা, ব্যবসায়ীরা ও শিল্পোদ্যোক্তারা সরকার-নির্ধারিত হারে কর দিচ্ছি। ইউটিলিটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। এর পরও কেউ পাবে, কেউ পাবে না—এই বৈষম্যের কারণেও নগরায়ণে কোনো শৃঙ্খলা আসছে না। রাজধানীর মতিঝিলে ৩৭ তলা সিটি সেন্টার ভবন রয়েছে। কিন্তু এরপর একই উচ্চতার ভবনের অনুমোদন চাইলে ভবন দেবে যাবে, পরিবেশ নষ্ট হবে, মাটি এত ওজন নিতে পারবে না—এ ধরনের অজুহাতে আর ওই উচ্চতার ভবনের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না, যা অবান্তর।

 কর কাঠামোতে সমস্যা কী? তা উত্তরণে আপনারা কী চাইছেন?

আলী আফজাল : বাজেট প্রণয়নের শেষ ভাগে আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর কর কাঠামো সংশোধন নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ে অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু কমানোর পরিবর্তে নতুন করে বোঝা চেপেছে। বাজেটে আমাদের সাপোর্ট শিল্পের বিভিন্ন পণ্যের ওপর যে করারোপ করা হয়েছে, তা মোট ৪৪ শতাংশের মতো। তার ওপর আমাদের ফ্ল্যাট বা জমির রেজিস্ট্রেশন খরচ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।

আবাসন খাতে ব্যাংকঋণের চাহিদা ও জোগান কেমন?

আলী আফজাল : আওয়ামী সরকারের লুটপাটের সহযোগী ব্যবসায়ীরা ঋণের নামে ব্যাংক থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা তছরুপ করেছে। ফলে ব্যাংকে তো টাকা নেই। আবাসন খাতে লম্বা সময় ব্যাংকের কোনো বিনিয়োগ নেই। তাছাড়া আবাসনে ঋণের যে উচ্চ সুদ হার, তা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতায় অনেক ক্রেতার পক্ষে টাকা ফেরত দেওয়া কঠিন।

 ব্যবসার ক্ষেত্রে রিহ্যাব সদস্যরা কোন ধরনের সমস্যার মুখে পড়ছেন?

আলী আফজাল : আমরা সরকারকে বলেছি, একটা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস করে দিন এবং বর্তমান ফি যদি এক লাখ থাকলে দ্বিগুণ করেন—আপত্তি নেই। কিন্তু এক লাখ দেওয়ার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে ১০ লাখ টাকা খরচ করতে চাই না। একদিকে ঘুস দিতে হয়, অন্যদিকে প্ল্যান হাতে পেতে এক থেকে দুই বছর লেগে যায়। আমাদের কথা পরিষ্কার, ডকুমেন্টস লাগবে উল্লেখ থাকলে সবসহ জমা দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে প্ল্যান দিতে হবে। রেজিস্ট্রার অফিসে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় কোনো মানুষের সম্পৃক্ততা থাকবে না।

এ খাতে আরেকটি শুভঙ্করের ফাঁকি দেশের আমলারা করে রাখছেন। ধরুন, মিরপুরে একটা বড় ফ্ল্যাটের দাম আড়াই কোটি টাকা। আইনানুযায়ি, মৌজা ও বর্গফুটের দর ধরা আছে, আবার শতাংশেরও আছে। রাষ্ট্র বলছে, এটা হচ্ছে মিনিমাম রেট। মিনিমাম রেট মানে কী? ওটায় পাঁচ টাকা বেশি দিলেই আপনি রেজিস্ট্রি করতে পারেন। ফলে আড়াই কোটি টাকা হালাল হয়ে গেল মাত্র ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে! কিন্তু ওই ফ্ল্যাট বানানোর খরচ যদি ২ কোটি ২০ লাখ টাকাও হয় এবং আমার মুনাফা ৩০ লাখ টাকা। তাহলে রাষ্ট্রীয় আইনের কারণে আমি দুই কোটি টাকা দেখাতে পারছি না। ফলে আমার হালাল টাকাও অপ্রদর্শিত থেকে যাচ্ছে।

সরকারের ভুল সিস্টেমের কারণে বৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ অপ্রদর্শিত রাখতে হচ্ছে। এই ফ্ল্যাট বেচাকেনায় প্রতি বছর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা এভাবে অপ্রদর্শিত হয়। তাহলে এ অর্থ যাবে কোথায়? এটা শো করলে এনবিআর যে ঝামেলা শুরু করে তা বর্ণনাতীত। এজন্য ব্যবসায়ীরা টাকাটা পাচার করে। সেজন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছি সিস্টেম বদলাতে।