বৃহস্পতিবার সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান সরকারি দলের পাঁচজন ও বিরোধী দলের পাঁচজনকে নিয়ে এ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করলে স্পিকার তা অনুমোদন করেন। কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি জাতীয় সমস্যা সমাধানে সংসদ কেন্দ্রবিন্দু হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদই হলো যেকোনো সমস্যা সমাধানের একমাত্র প্ল্যাটফর্ম। সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল ফোরাম। এখানে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের সমান গুরুত্ব। একটি অর্থবহ এবং শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য কার্যকর এবং ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ জরুরি। যেখানে সরকার এবং বিরোধী দল মিলে জনগণের জন্য কাজ করে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবেই। নির্বাচনে বিজয়ী দল তার নির্বাচনি কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে। বিরোধী দলের কাজ হলো সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা। সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা এবং খারাপ কাজের সমালোচনা করে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকার এবং বিরোধী দল মিলেই সংসদ। সরকারি দল যদি বিরোধী দলকে উপেক্ষা করে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সবকিছু চাপিয়ে দিতে চায় তাহলে তা আর গণতন্ত্র থাকে না। বিরোধী দলকে অস্বীকার করে সংসদ এবং দেশ পরিচালনা করলে একটি নির্বাচিত সরকারও স্বৈরাচারী হয়ে যায়। অতীতে এমন অনেক নজির আছে। আবার বিরোধী দল যদি সংসদে এবং সংসদের বাইরে দায়িত্বশীল আচরণ না করে তাহলেও গণতন্ত্র ঝুঁকিতে পড়ে। সংসদ হয়ে যায় অকার্যকর। তাই সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা, খারাপ কাজের সমালোচনা করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সংকটে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের এবং দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে বিরোধী দলকে। বিরোধী দলের দায়িত্বশীল আচরণ কেবল সংসদকেই কার্যকর এবং প্রাণবন্ত করে না, গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়। কিন্তু বাংলাদেশে গত বারোটি সংসদে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের দায়িত্বশীল আচরণ ছিল অনুপস্থিত। ক্ষমতাসীনরা তাদের ইচ্ছামতো দেশ পরিচালনা করেছে। সংসদে বিরোধী দলকে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। আবার বিরোধী দলও সবকিছুতে না বলতে বলতে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করেছে। সংসদের বাইরে জ্বালাও-পোড়াওয়ের আন্দোলন করে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছে। ফলে একদিকে যেমন সংসদ অচল হয়েছিল, তেমনি গণতন্ত্রও বিকশিত হয়নি। ত্রয়োদশ সংসদে সংসদ নেতার এই উদারতা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে এটা প্রথম এরকম ঘটনা হলেও বিশ্বে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং নিয়মিত ঘটনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একাধিক কার্যকর কমিটি রয়েছে। এই কমিটিগুলো এত ক্ষমতাবান যে, তারা প্রেসিডেন্টের অনেক নির্বাহী আদেশ রহিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেনের বর্বরোচিত হামলার পর কংগ্রেসের সিনেট এবং প্রতিনিধি সভা (House of Representatives)-এর সদস্যদের নিয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এ কমিটিতে রিপাবলিকান দলের এবং ডেমোক্র্যাটদের সমান সংখ্যক প্রতিনিধি রাখা হয়েছিল। তাদের কাজ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া। আমেরিকায় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার থাকলেও কংগ্রেসের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। যুক্তরাজ্য বিশ্বের সংসদীয় গণতন্ত্রের আঁতুড়ঘর। ব্রিটেনে বিরোধী দল ছাড়া সরকার অচল। সব মন্ত্রণালয়ের কাজ তদারকি করে পার্লামেন্টারি কমিটি। যেখানে সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব থাকে। সংসদ নেতা নিয়মিত বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কথা বলেন। অতি সম্প্রতি ইরান যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সর্বদলীয় পার্লামেন্টারি কমিটির বৈঠক আহ্বান করেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, ব্রিটেন এই যুদ্ধের অংশ হবে না। গত সপ্তাহে সেখানকার প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। সেই বৈঠকের পর যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি বিবৃতি দেন। যুক্তরাজ্যে জাতীয় সংকটে সরকার ও বিরোধী দল ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করেন। এ কারণেই দেশটির গণতন্ত্র সুসংহত।
চেতনায়২৪ ডেস্ক : 

































